স রকারি নিয়মের ফাঁসে কী ভাবে মানুষের প্রাণ যায়, তাহার উদাহরণ কম নাই। সেই তালিকায় একটি মর্মান্তিক মৃত্যু যোগ হইল। সরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত থাকা সত্ত্বেও তাহা দিতে অস্বীকার করায় এক সদ্য-প্রসূতি প্রাণ হারাইলেন কল্যাণীতে। কোনও সভ্য দেশে ইহা অকল্পনীয়। রক্ত না দিলে রক্ত মিলিবে না, এমন বিধি নাই। বরং প্রসূতিমৃত্যু এড়াইবার কড়া নির্দেশ রহিয়াছে। তৎসত্ত্বেও যে ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মী রক্ত দেন নাই, তাহার কারণ তিনি নিঃশঙ্ক। রোগীকে হয়রান করিলে শাস্তি হইবে, এমন ভয় নাই। বস্তুত যে কোনও সরকারি পরিষেবা পাইবার শর্তই হয়রানি। জজের পেজের ভাই ভেজ-ও তাহার কুড়াইয়া-পাওয়া কয়েক বিন্দু ক্ষমতার প্রয়োগ করিয়া যদি অসহায় মানুষকে না ছুটাইল, না কাঁদাইল, তবে কীসের ক্ষমতা? নাগরিক যে আসলে ভিখারি, তাহা মনে করাইতে হইবে না? যে কোনও পরিষেবা পাইবার যতগুলি শর্ত সরকার স্থির করিবে, কর্মীরা তাহার উপর আরও কয়েক ডজন শর্ত চাপাইবে। যাহা কয়েক মিনিটের কাজ, তাহার জন্য দু’মাস ঘুরাইবে। এই নির্লজ্জ বাবুগিরি সর্বত্র প্রকট, সর্বদা প্রশ্রয়প্রাপ্ত। তাই ব্লাড ব্যাঙ্কের এক কর্মচারী রক্তের মতো প্রাণদায়ী বস্তুও প্রত্যাখ্যান করিতে পারে। তাহার সিদ্ধান্ত বৈধ কিনা, প্রত্যাখ্যানের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তাহার পরিণাম কী হইতে পারে, এমন কোনও কিছুই সে বিবেচনা করে নাই। কারণ বিবেচনার অভ্যাস তাহার তৈরি হয় নাই। যে দিন সরকারি পরিষেবা দানের নিমিত্ত চেয়ারে সে বসিয়াছে, সেই দিন হইতেই জনগণকে অপমান ও হয়রান করিবার প্রশ্নাতীত ক্ষমতা তাহার জন্মিয়াছে। সংবিধান ও আইনের চোখে যাহা নাগরিকের ‘অধিকার’, সরকারি কর্মীদের চোখে তাহা অনুগ্রহ। তাই বিধিরও প্রয়োজন নাই, স্রেফ নিয়মের জুজু দেখাইয়া তাহারা মানুষ মারিতে পারে।
নিয়ম এমন সংবেদনহীন, প্রাণঘাতী বলিয়াই নিয়ম ভাঙিবার তাগিদও উগ্র, বেপরোয়া। সরকারি হাসপাতালে ভাঙচুর, ডাক্তার-নার্স নিগ্রহ কখনওই সমর্থনযোগ্য নহে। কোনও যুক্তি দিয়াই এগুলির সপক্ষে সওয়াল করা চলে না। কিন্তু ভাঙচুর কেন হয়, তাহার ইঙ্গিত মেলে কল্যাণীর ওই হাসপাতালের ঘটনায়। তরুণীর স্বামী যদি প্রভাবশালী হইতেন, তাঁহার সঙ্গীরা যদি ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীকে ধমক-চমক করিতেন, তাহাতে বিশৃঙ্খলা হইলেও তরুণীর প্রাণ সম্ভবত বাঁচিত। হাসপাতাল রোগীর পরিবারের উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে বলেই তাঁহারাও পাল্টা চাপ দিবার চেষ্টা করেন। এই অপ্রিয় সত্য এড়াইবার উপায় নাই।
রোগী ভর্তি করিলে সেই রোগীর দায়িত্ব যে হাসপাতালের, সেই মৌলিক সত্যটি যেন সরকারি হাসপাতাল ভুলিয়াছে। রোগীর ভালমন্দের দায় পরিবারের উপর চাপাইয়া দেয় হাসপাতাল। কোথায় যাইতে হইবে, স্ট্রেচার কোথায় মিলিবে, কী চিকিৎসা সরঞ্জাম লাগিবে, তাহার ব্যবস্থা, জোগাড়যন্ত্র করিতে পরিবারের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। দালালের প্ররোচনা, আয়া-ওয়ার্ড বয়ের রক্তচক্ষু সহ্য করিবার পরেও পরমাত্মীয়ের জন্য যথাসময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে না পারিবার জন্য মরমে মরিয়া থাকিতে হয় আত্মীয়দের। রক্তের জন্য চিরকুট কেন রোগীর আত্মীয়ের হাতে ধরাইতে হইবে, কেন হাসপাতাল আপৎকালীন অবস্থায় রক্ত, ঔষধ জুগাইবার ব্যবস্থা করিবে না? না করিলে তাহা কাহার দায়? মাতৃহীন নবজাতক সরকারের নিকট এই প্রশ্নের উত্তর দাবি করিতেছে। সৎ উত্তর।