আটচল্লিশের তুলনায় বারো নিতান্তই ছোট একটি সংখ্যা। মহাসামরোহে অতিক্রান্ত নারী দিবসের অনতিদূরে বসিয়া সংখ্যা দুইটির দূরত্ব যেন আরও বেশি করিয়া ধাক্কা দিবার মতো। কেননা, কোনও সমারোহের মোড়কেই লুকাইয়া রাখা য়ায় না এই সামান্য সংখ্যাতত্ত্ব যে, আটচল্লিশ শতাংশ নারী-অধ্যুষিত এই দেশের সংসদে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা এখন মাত্র বারো শতাংশ। স্বাধীনতার পর সাত দশক পূর্ণ হইতে আর কয়েকটি মাস বাকি, এ দিকে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি-সভায় ভারতীয় নারীরা এখনও মোট প্রতিনিধির এক-অষ্টমাংশের বেশি ছাড়াইতে পারেন নাই। এ দেশে মেয়েদের ক্ষমতায়নের পুরা ছবিটি নিশ্চয়ই এই সংখ্যার আয়নায় ধরা পড়ে না। তেমন দাবি কেহ করিতেছেনও না। কিন্তু সংগঠিত রাজনীতির মঞ্চে এত পিছাইয়া থাকিলে ক্ষমতায়ন যে কোনও ভাবেই সম্পূর্ণ হইতে পারে না, তাহা বুঝিতে বিশেষ বেগও হয় না। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় কয়েক দিন আগে এই মোক্ষম সত্যটির দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। তাঁহার মন্তব্যের প্রেক্ষিতটি ছিল কেন্দ্রীয় সংসদে ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলা আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব। এই মর্মে সংবিধান সংশোধনীর আলোচনা বেশ কিছু কাল ধরিয়াই চলিতেছে, রাজধানীতে মহিলা প্রতিনিধিদের সভায় আরও এক বার আলোচনাটি উত্থাপিত হওয়ায় তিনি চোখে আঙুল দিয়া পরিস্থিতি দেখাইয়া দিলেন।
আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব নিশ্চয়ই ভাবিয়া দেখিবার মতো, যদিও সংরক্ষণই ক্ষমতায়নের প্রধানতম পথ হওয়া বাঞ্ছনীয় কি না, তাহা লইয়া সংশয়-সন্দেহের কমতি নাই। সংরক্ষণ কেবল একটি সীমিত সময়ের জন্যই কার্যকর হওয়া উচিত, এই মতও গুরুত্ব দিয়া ভাবার যোগ্য। তবে একটি কথা এ প্রসঙ্গে ভাবা বিষম জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলি কেন আরও বেশি করিয়া মহিলা প্রার্থী সংগ্রহ করিবার চেষ্টা করিবে না? এখনও অবধি প্রতিটি প্রধান দলের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা এত দৃষ্টিকটু রকমের কম যে তাহার পর এই দলের নেতৃবৃন্দেরই মুখে নারীর অধিকার বর্ধন, রক্ষণ, সংরক্ষণ ইত্যাদি সব রকম স্লোগানই অতীব জোলো শুনায়। বাম দলগুলি ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয়কেই মনে করাইয়া দেওয়া যায় যে, পার্লামেন্টে গিয়া মহিলা আসন সংরক্ষণ লইয়া গলা ফাটাইবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দলে মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা বাড়াইবার চেষ্টা না করিলে লোকে ‘দ্বিচারী’ বলিতেই পারে। প্রসঙ্গত, গত লোকসভা নির্বাচনে, পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেস ১১ জন মহিলা প্রার্থীকে দাঁড় করাইতে পারিয়াছিল। বাম পক্ষ হইতে? মাত্র ৬!
প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, নারীর ক্ষমতায়নের চিহ্নক হিসাবে নারী প্রতিনিধিকে উঠিয়া আসিতে দেখাটা কেন এত জরুরি? প্রতিনিধিত্বই কি ক্ষমতায়নের আবশ্যিক সোপান? প্রতিনিধিত্বের তাত্ত্বিকরা এ বিষয়ে নানা রকম মত দিতে পারেন, কিন্তু সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিকে দেখা এবং প্রতিনিধির সমাজের জন্য কিছু প্রভাব রাখিয়া যাইবার চেষ্টার কোনও বিকল্প এখনও পর্যন্ত জানা নাই। এই কারণেই আইডেন্টিটি রাজনীতির তুফান বহিতেছে গোটা গণতান্ত্রিক বিশ্বে। নারীর অধিকার বা আইডেন্টিটির প্রশ্নও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার সহিত অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত। এবং এ ক্ষেত্রে যেহেতু জনসংখ্যার একেবারে আধাআধি এই আইডেন্টিটির প্রসার, প্রশ্নটিকে উচ্চতম গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা না করিলে বড় ভুল ঘটিবে।