অ বশেষে যথার্থ রেলসংযুক্তি ঘটিল ত্রিপুরার। নবনির্মিত ব্রড গেজ লাইনে আগরতলা হইতে রবিবার দিল্লি যাত্রা করিয়াছে ত্রিপুরাসুন্দরী এক্সপ্রেস। বাংলাদেশের আখাউড়া ও আগরতলাকে সংযুক্ত করিতে রেলপথ নির্মাণের সূচনাও হইয়াছে। দুইটি দেশের রেলমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তাঁহারা আরও স্বপ্ন দেখাইয়াছেন। এশিয়ার বৃহত্তর বন্দর বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সহিত ভারতের রেলসংযুক্তি হইবে। রেলে চড়িয়া ভারতের পর্যটকরা বাংলাদেশ হইয়া দেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলিতে যাইবেন। ভারত সরকার ইহাকে পর্যটনের নবদিগন্ত বলিয়া ভাবিতে পারে। ত্রিপুরাবাসীর নিকট ইহা হারাধন ফিরিয়া পাইবার শামিল। স্বাধীনতার পূর্বে আগরতলা হইতে কলিকাতা আসিতে ৩৭২ কিলোমিটার যাত্রা করিতে হইত। স্বাধীনতা ও দেশভাগের পরে ১৮৭২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করিতে হয়। দীর্ঘ সাত দশক ধরিয়া ত্রিপুরার মানুষ রেলসংযুক্তির দাবি জানাইয়াছেন। সংসদে প্রথম দাবি উঠিয়াছিল ১৯৫২ সালে। তাহার দুই দশক পর অসম-লাগোয়া চোরাইবাড়ি হইতে ধর্মনগর পর্যন্ত পনেরো কিলোমিটার রেল চলাচল শুরু হয়। আগরতলা পর্যন্ত মাত্র ১৫৮ কিলোমিটার পথ আসিতে ২০১২ সাল লাগিয়াছে। তাহাও মিটার গেজ রেল। ত্রিপুরার অধিকাংশ এলাকা এখনও রেলসংযুক্ত হয় নাই। সবুরে মেওয়া ফলিয়াছে, কিন্তু অতি-দীর্ঘ প্রতীক্ষা কি তাহার স্বাদকে ঈষৎ ফিকা করে নাই?
কয়েক প্রজন্মের কর্মজীবন অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে রেল-বিচ্ছিন্নতায়। বৃহত্তর ভারতের উন্নততর অর্থনীতি ও জনজীবনে যোগ দিবার সুযোগ তাঁহারা পান নাই। ভৌগোলিক দূরত্ব মানব উন্নয়ন ও আর্থিক বৃদ্ধির দূরত্বে পরিণত হইয়াছে। নবনির্মিত রেললাইন ধরিয়া দিল্লি পৌঁছাইতে ৪৭ ঘন্টা লাগিবে। ভারতের দীর্ঘতম রেলযাত্রার অন্যতম এটি। তৎসত্ত্বেও ইহা ত্রিপুরা, পশ্চিম মণিপুর, দক্ষিণ অসম এবং মিজোরামের কয়েক লক্ষ মানুষের নিকট আশীর্বাদ। ইহাতে তাঁহাদের বিচ্ছিন্নতা কিছুটা ঘুচিবে। রবিবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতীয় রেলমন্ত্রী ঘোষণা করিয়াছেন, ২০২০ সালের মধ্যে উত্তরপূর্বের সবগুলি রাজ্যের রেলসংযুক্তি হইয়া যাবে। আশ্বস্ত হইয়াও আক্ষেপ হয়, এত দিন হয় নাই কেন? ভারত মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠাইয়াছে, অথচ উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে রেল পাঠাইতে পারে নাই। ইহা অর্থের অভাবে নহে, ভ্রান্ত রাজনীতিই উত্তরপূর্বকে বঞ্চিত করিয়াছে।
তাহাতে ভারতের বিদেশ নীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। নরসিংহ রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে ভারত ‘পূর্বে দেখ’ নীতি লইয়াছিল। দল-নির্বিশেষে পরবর্তী সকল সরকার তাহা গ্রহণ করিয়াছে। ‘পূর্বে দেখ’ ভারতের কূটনীতির একটি বিশেষ মাত্রা। সেই নীতির দৃষ্টিতে উত্তরপূর্ব অতি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ, ভুটান, চিন, নেপাল ও মায়ানমার, পাঁচটি রাজ্যের সহিত সীমান্ত রহিয়াছে উত্তরপূর্বে। উত্তরপূর্বাঞ্চল ‘ভূমিবদ্ধ এলাকা’ হইতে ‘ভূপথ সংযোগ’ হইয়া উঠিবে, নীতির নিরিখে তেমনই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে ভারতের অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন সত্ত্বেও এই অঞ্চলের পরিকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থায় যথেষ্ট উন্নতি হয় নাই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো দুয়েকটি সূচক ব্যতীত উন্নয়নের প্রায় সকল দিকেই ইহা পশ্চাৎপদ। একটি বাণিজ্য সংগঠনের সমীক্ষা বলিতেছে, ২০২১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে যত কাজের সুযোগ তৈরি হইবে, প্রয়োজন তাহার আটগুণ। যুবসমাজের হতাশা কী ভয়ানক সংঘাত ঘটাইতে পারে, তাহার পরিচয় গত কয়েক দশকে মিলিয়াছে। আরও একটি প্রজন্মকে সেই আবর্তে নিক্ষেপ করা চলিবে না। প্রতিবেশীর সহিত কূটনীতির কুশলতায়, কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতির নৈপুণ্যে, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগে উত্তরপূর্বের প্রতি ন্যায় করিবার সময় আসিয়াছে। আর বিলম্ব নহে।