স ম্প্রতি দুটি ঘটনায় ঔষধের দামের ন্যায্যতা লইয়া পুনরায় বিতর্ক উঠিয়াছে। এক, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে স্কুলছাত্ররা অতি সামান্য খরচে এক জীবনদায়ী ঔষধ প্রস্তুত করিয়াছে, মার্কিন বাজারে যাহার দাম সাড়ে সাতশো ডলার। অতএব প্রশ্ন উঠিয়াছে, যাহার নির্মাণপদ্ধতি জটিল নহে, উপাদানও সুলভ, তেমন ঔষধের অত্যধিক দাম হইবে কেন? দুই, একাধিক ঔষধের সংযোগে প্রস্তুত, এমন তিনশোটিরও বেশি ঔষধের (‘কম্বিনেশন ড্রাগ’) ব্যবহারের উপর ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছিল, তাহাতে পদ্ধতিগত ক্রুটির জন্য দিল্লি হাই কোর্ট তাহা খারিজ করিয়াছে। ইহার পর চিকিৎসকদের নানা সংগঠন আবেদন করিয়াছেন, ডাক্তাররা যেন ওই ঔষধগুলি না লেখেন। কারণ তাহাতে রোগীর ঝুঁকি ও খরচ দুই-ই বাড়িতে পারে।
ঔষধের দাম বরাবরই বিতর্কের বিষয়। তাহাতে উভয়পক্ষেরই যুক্তি আছে। নির্মাতাদের বক্তব্য, একটি নূতন ঔষধ প্রস্তুত করিতে দীর্ঘ গবেষণা করিতে হয়। তাহার জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, ঔষধের দামে তাহার প্রতিফলন থাকিতে বাধ্য। কেবল উপাদানের এবং উৎপাদনের খরচ দিয়া ঔষধের দাম নির্ধারণ করিলে অন্যায় হইবে। অপর দিকে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত চিকিৎসক ও সমাজকর্মীদের বক্তব্য, সকল ঔষধের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে না। বহু ক্ষেত্রে ‘নূতন’ ঔষধ বলিয়া যাহা বাজারে আনা হয় তাহা বস্তুত পরিচিত নানা ঔষধের সংযোগ। এমন সংযোগ প্রায়ই যুক্তিহীন, এমনকী ক্ষতিকর। ভারতের অত্যাবশ্যক ঔষধের তালিকায় মাত্র ১৬টি ‘সংযুক্ত ঔষধ’-এর উল্লেখ রহিয়াছে। অথচ এমন ঔষধ ভারতের বাজারের চল্লিশ শতাংশ জুড়িয়া বসিয়াছে। এগুলির নাম লিখিবার জন্য চিকিৎসকদের নানা উৎকোচ দেয় নির্মাতা সংস্থাগুলি। এ সমস্যা দীর্ঘ দিনের। প্রতিকারের চেষ্টাও হইয়াছে। তিনশোর অধিক ঔষধে কেন্দ্রের নিষেধাজ্ঞা তাহার একটি। হাই কোর্ট খারিজ করায় বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে উঠিবে।
কিন্তু ঔষধ সহজলভ্য করিতে হইলে কেবল আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যথেষ্ট নহে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঔষধের দাম সাড়ে সাতশো ডলার, তাহা পূর্বে ছিল তেরো ডলার। এক ব্যবসায়ী তাহার স্বত্ব কিনিয়া রাতারাতি তাহার দাম কয়েকশো গুণ বাড়াইয়াছেন। ইহা অনৈতিক, কিন্তু আইনসিদ্ধ। মেধাস্বত্বের সহিত স্বাস্থ্যের অধিকারের ভারসাম্য রাখিবার কঠিন কাজটি করিতে গিয়া আইনের সহিত বারবার এমনই সংঘাত বাধিয়াছে জনস্বার্থের। এই সংকট গোটা বিশ্বের। সুচিকিৎসার যে চারটি বাধাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দিষ্ট করিয়াছে, তাহার একটি ঔষধের দাম। ভারতে চিকিৎসার খরচের জন্য বহু দরিদ্র পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়, বহু নিম্নবিত্ত পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে নামিয়া যায়। ইহার প্রতিকারে সরকার নানা ব্যবস্থা লইয়াছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ঔষধ, ন্যায্য মূল্যের ঔষধের দোকান, ব্র্যান্ডের পরিবর্তে জেনেরিক ঔষধের নাম লেখা, এই সকল ব্যবস্থা কার্যকর করিবার চেষ্টা চলিতেছে। তাহাতে ঔষধের দামের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসিয়াছে নিশ্চয়। কিন্তু চিকিৎসার বৃহত্তর অংশই আজও রহিয়া গিয়াছে সরকারি ব্যবস্থার বাইরে। ঔষধের অনাবশ্যক ব্যবহার এবং অযৌক্তিক দাম চিকিৎসার খরচ বাড়াইতেছে। নজর রাখা আবশ্যক। তিনশো চুয়াল্লিশটি ঔষধ নিষিদ্ধ করিবার মামলায় কেন্দ্র যদি জিতিয়াও যায়, অনেক লড়াই বাকি থাকিবে।