শিক্ষকতার চাকরি হারিয়ে কেউ ফের পরীক্ষায় বসেছেন। দিন গুনছেন, আবার কবে নতুন করে ইন্টারভিউ দিয়ে স্কুলে যোগ দেবেন। কেউ বা আবার পরীক্ষায় পাশই করতে পারেননি। স্কুল শিক্ষক নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মামলায় যাঁদের জীবনের সব কিছু এক ধাক্কায় বদলে গিয়েছে, অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে জীবন, তাঁদের কাছে আসন্ন বিধানসভা ভোটের গুরুত্ব কেমন?
প্রায় সকলেই দাবি করেছেন দুর্নীতিমুক্ত সরকার গঠিত হোক, আর কোনও প্রার্থীর জীবন যেন তাঁদের মতো তছনছ না হয়ে যায়।
২০১৬-এ চাকরি পেয়েও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে চাকরি খোয়াতে হয়েছে। ২০২৫-এর এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ প্যানেলই বাতিল করে দিয়েছে। নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশে ১৫,৪০৪ শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মহারা হয়েছেন। চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষক মেহবুব মণ্ডল বলেন, “নির্বাচন আসন্ন। সরকার গড়বে কোন দল, তা জানা নেই। যদি বর্তমান শাসককে সরিয়ে নতুন কোনও দল ক্ষমতায় আসে, তা হলেও তারা কি ‘যোগ্য’ বঞ্চিতদের নিয়োগের দায়িত্ব নেবেন?” তাঁর প্রশ্ন, দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে কোনও ভাবে চাকরি পেলেন না যে চাকরিহারারা, তাঁদের কী হবে? সব দলই যে তাঁদের সামনে রেখে নির্বাচনের ফসল ঘরে তুলতে চাইছে, তা-ও মনে করেন মেহবুব।
উচ্চ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও চিত্রটা প্রায় একই। গত কয়েক বছরে সর্বত্র চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক। দুর্নীতির অভিযোগে চাকরিতে যোগ দিয়ে নতুন জীবন শুরু করেও তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছে । তাঁদের কারও কাছে এই নির্বাচন শুধুই প্রহসন, কারও কাছে আশার আলো।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের এক শিক্ষক প্রার্থী জানান, ২০১৬-র প্যানেলে তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। দুর্নীতির অভিযোগে সব তছনছ হয়ে গেল। ‘অযোগ্য’দের তালিকায় আমার নাম নেই। তবু, নতুন করে পরীক্ষা দিয়েছি। পাশও করেছি। কিন্তু ইন্টারভিউতে কী হবে জানি না। চাকরি পেতে হলে দু’বার যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়ার ইতিহাস এই রাজ্যেই প্রথম।” তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকুক বা নতুন কেউ আসুক— প্রশাসন যেন দুর্নীতিমুক্ত হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
আরও পড়ুন:
অন্য আর এক শিক্ষকপদ প্রার্থী বলেন, “নবম-দশম স্তরের পরীক্ষায় পাশ করেছি। কিন্তু মনের মধ্যে ভয় কাটছে না, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফের যদি অস্বচ্ছতা তৈরি হয়! দুর্নীতি মুক্ত সরকার না হলে সমাজ শেষ হয়ে যাবে। এই বিধানসভা নির্বাচন হয় আমাদের বাঁচাবে না হলে আরও শেষ করে দেবে।”
অন্য দিকে, গত ১০ বছর দুর্নীতির কারণে বাতিল হওয়া প্যানেলে নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন চলছে উচ্চ প্রাথমিকের শিক্ষক পদপ্রার্থীদের। ২০২৬-এও নিয়োগ পাননি ১২৪১ জন শিক্ষক পদপ্রার্থী। অথচ, হাই কোর্ট তাঁদের নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। শিক্ষাসচিব এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানকে আগামী ৩০ মার্চ আদালতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এমন সরকার আসুক যারা বঞ্চিত যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাশে দাঁড়াবে।
পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ প্রাথমিক মঞ্চের সভাপতি সুশান্ত ঘোষ বলেন, “আদালতের নির্দেশে আমাদের চাকরি দেওয়ার কথা সরকারের। ৩০ মার্চ এই মামলার রায়ও রয়েছে। আমরা চাই রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা ভুলে যোগ্যদের অবিলম্বে নিয়োগ করা হোক। ভোটের রাজনীতির মাঝে আমরা যেন রাজপথেই না থাকি।”
এ দিকে ইউনাইটেড পশ্চিমবঙ্গ এনএসকিউএফ (ন্যাশনাল স্কিল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক) টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিরুপম কোলে জানান, গত ডিসেম্বর থেকে তাঁদের বেতন হয়নি। গোটা রাজ্যে ১৬০০-র বেশি স্কুলে প্রায় তিন হাজার পূর্ণসময়ের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন এই বৃত্তিমূলক শিক্ষায়। তাঁরা পড়াচ্ছেন, কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না। ২০১৩ সালের পর দীর্ঘ ১৩ বছরে একবারও বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এজেন্সির মাধ্যমে বেতন দেওয়ার এই পরিস্থিতির বদল চান তাঁরাও। নিরুপমের গলায় সংশয়, “বিধানসভা নির্বাচন আদৌ আমাদের পরিস্থিতির পরিবর্তন করাতে পারবে কি না কে জানে!”