ছোটবেলা থেকেই চেপে বসছে ইন্টারনেটের নেশা। মোবাইল বা ট্যাবলেটেই কেটে যাচ্ছে স্কুলপড়ুয়াদের দিনের বেশির ভাগ সময়। সম্প্রতি বিহার বিধানসভায় রাজ্য সরকারের তরফে একটি নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্কুলপড়ুয়ারা দিনে কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে, তাদের চোখ কতক্ষণ থাকবে নীল আলোয়— তার সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে আদৌ এ ভাবে নীতি প্রণয়ন করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব?
মডার্ন হাই স্কুল-এর অধিকর্তা দেবী করের মতে, “সময় বদলাচ্ছে। তাই কোনও কিছুর ভাল-মন্দ বোঝানোর জন্য বকাবকি করে বা নিয়ম বিধি চালু করলেই সন্তোষজনক ফল পাওয়া যাবে না। বরং অনলাইন মাধ্যমেই পাওয়া সঠিক তথ্য দেখিয়ে শিশুদের বোঝানো দরকার। মোবাইল বা ট্যাব নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাদের বোঝাতে হবে।”
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সিরা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত মোবাইল কিংবা ট্যাবলেট ব্যবহার করে। এতে অল্প বয়সেই তাদের দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে মস্তিষ্কেও। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এক থেকে দু’ঘণ্টা পর্যন্তই সর্বাধিক ‘স্ক্রিন টাইমিং’ থাকা উচিত।
অতিমারি পর্ব পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনলাইনে ক্লাস করানো হয় অনেক স্কুলে। সে ক্ষেত্রে মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু তাতেও বাড়ছে অন্য সমস্যা।
পাঠভবনের শিক্ষক তন্ময় মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “এ ভাবে অনলাইন পঠনপাঠন ব্যবস্থায় শিক্ষাক্ষেত্রে ফাঁক থেকে যাচ্ছে বলেই আমি মনে করি। মুখোমুখি বসিয়ে পড়াশোনা করলে শিক্ষার গভীরতা বাড়ে। ট্যাবে বা মোবাইলের কোর্সে হয়তো পাঠ্য বিষয় সম্পূর্ণ করা গেল। কিন্তু শিক্ষা অসম্পূর্ণই থেকে গেল।”
এতে শৈশবের স্বাভাবিক তালটিও কেটে যাচ্ছে বলে মনে করছেন গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলের অধ্যক্ষা দেবযানী সরকার। তাঁর কথায়, “শিশুরা ছোট থেকে নতুন কিছু শিখছে। কিন্ত তার খারাপ প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই মোবাইল ব্যবহার যেমন দরকার, তেমনই বই পড়া কিংবা বাইরে গিয়ে খেলাধুলাও সমান ভাবে করতে হবে। তবেই সামঞ্জস্য আসবে।”
তবে, স্কুলের বাইরে ছেলেমেয়েরা কী ভাবে সময় কাটাচ্ছে, তা দেখার দায়িত্ব স্কুলের থেকেও বেশি পরিবারের। লা মার্টিনিয়র ফর বয়েজ়-এর সচিব সুপ্রিয় ধর বলেন, “আমরা স্কুলে সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করি। কিন্তু বাড়ি থেকেই যদি হাতে ফোন বা ট্যাব দিয়ে দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করণীয় থাকে না।”
ইন্টারনেটে পাওয়া সব তথ্য তো শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। সে ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ থাকলে এই সম্পর্কে তাদের বোঝানো সহজ বলে মনে করছেন যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধানশিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য।