এআই— আতঙ্কের নতুন নাম? এআই বা কৃত্রিম মেধা নাকি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষের কাজের জগতে থাবা বসাতে চলেছে!
ইলন মাস্ক বার বার বলেছেন, ভবিষ্যতে মানুষের কাজ করাটা বাধ্যতামূলক থাকবে না, বরং শখে পরিণত হবে। মাস্ক কথাটা যত হালকা চালেই বলে থাকুন না কেন, খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে তা আতঙ্ক তৈরি করছে। বেকারত্বের সিঁদুরে মেঘ ঘনাচ্ছে গোটা বিশ্ব জুড়ে। কিন্তু সত্যিই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হলেও কোনও কোনও চাকরি বেঁচে যেতে পারে। আবার প্রশ্ন উঠছে বিশেষ কোনও কোনও কাজ নিয়েও। সত্যিই কি সে সব কাজ কৃত্রিম মেধার হাতে সঁপে দেওয়া যাবে নিশ্চিন্তে?
কৃত্রিম মেধার সাহায্যে জটিল অঙ্কের সমাধান সহজেই করে ফেলা সম্ভব। এমনকি, সহজে মানুষের শরীরের রোগ নির্ণয় করতে এখনই পারছে কৃত্রিম মেধা। রোবট পারছে অস্ত্রোপচার করতে। ভবিষ্যতে সে প্রযুক্তি আরও সফল হবে বলেই প্রত্যাশা। কিন্তু বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ কি আদৌ সম্ভব? বিচারের মতো সংবেদনশীল বিষয়েও কি মানুষের জায়গায় এসে দাঁড়াবে রোবট?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বহুজাতিক সংস্থার এআই বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, আইনি কাজের ক্ষেত্রে এআই-এর প্রয়োগ সীমিত। কোনও মামলায় জমা হওয়া নথির তথ্য যাচাই, তার অনুবাদ বা মমার্থ উদ্ধার করে দেওয়া পর্যন্তই কাজ করতে পারে কৃত্রিম মেধা। কিন্তু মামলার শুনানি চলাকালীন নীতি নির্ধারণ করা বা বাদী-বিবাদী পক্ষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, জবানবন্দি বিচার করার মতো যোগ্যতা অর্জন করা হয়তো কৃত্রিম মেধার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, সেখানে মিলে থাকে মানবিক যুক্তি পরম্পরা ও সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা। তাই, বিচার ব্যবস্থা যান্ত্রিক হয়ে গেলে ত্রুটির আশঙ্কা থাকবে। এমন কাজের ক্ষেত্রে মানুষের মেধা এবং দক্ষতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়াই শ্রেয় বলেই মনে করেন ওই বিশেষজ্ঞ।
উল্লেখ্য ২০১৯-এ ইউরোপের এস্টোনিয়ায় বছরের পর বছর জমতে থাকা মামলার চাপ কমাতে বিশেষ রোবটকে বিচারকের আসনে বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কৃত্রিম মেধার সাহায্যে যাতে বেশির ভাগ মামলায় নিষ্পত্তি করা যায়, তা সুনিশ্চিত করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে দেশের আইনমন্ত্রকের তরফেই প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে জানানো হয়, কৃত্রিম মেধাকে শুধুমাত্র শুনানির প্রতিলিপি তৈরির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় অবশ্য গত কয়েক বছর ধরেই কাজে লাগানো হচ্ছে কৃত্রিম মেধাকে। পুরনো মামলার তথ্য, নথি সংগ্রহের কাজেই তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিচারপতিরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে বিচার ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত শুনানি হয়েছে। সেখানে তাঁরা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, এই প্রযুক্তি কখনওই বিচার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব ফেলবে না।
আলিপুর আদালতের আইনজীবী প্রশান্ত মজুমদার বলেন, “এখন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে অপরাধের ধরনও বদলেছে। তাই ‘সায়েন্টিফিক এভিডেন্স’ বা বিজ্ঞানসম্মত প্রামাণ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাতে বিচার ব্যবস্থার কর্মপদ্ধতিতে কোনও প্রভাব পড়ছে না এবং পড়বেও না।” কারণ ওই সব প্রামাণ্য নথি শেষ পর্যন্ত খতিয়ে দেখবেন বিচারকই। তিনিই রায় ঘোষণা করবেন নিজের যুক্তি ও বিচার বোধ কাজে লাগিয়ে। তার বিকল্প কোনও যন্ত্র হতে পারে না।
তাই যাঁরা আইনি ব্যবস্থার অধীনে চাকরির কথা ভাবছেন, তাঁদের এআই সম্পর্কে জ্ঞান থাকা দরকার। কিন্তু ওই প্রযুক্তি কাজের সুযোগ কেড়ে নেবে, এমন আশঙ্কা আপতত করছেন না বিশেষজ্ঞেরা।