‘ডিম্বাস্ত্রে’ বধ হচ্ছে দুর্নীতি?
গত কয়েক দিনে উত্তর থেকে দক্ষিণ, রাজ্য জুড়ে ডিম ছোড়াছুড়ির দৃশ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক ভাবে বিদায়ী শাসক-নেতারাই ছিলেন লক্ষ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ডিম্বাস্ত্রের নিশানায় পড়েছেন নানা স্তরের মানুষ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষকেরাও। অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে দুর্নীতি এবং তৃণমূলের যোগ ছিল।
সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে দু’টি দৃশ্য। প্রথম দিন দেখা গেল, নদিয়ার এক শিক্ষককে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ মোবাইলে বন্দি করছেন সেই দৃশ্য, কেউ দেখছেন, কটু কথা শোনাচ্ছেন। শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দেরি করে স্কুলে আসেন।
দ্বিতীয় দিন দেখা গেল, মালদহের এক স্কুলের প্রধানশিক্ষককে। গোল করে ঘিরে ধরে তাঁকে ডিম ছুড়ে মারলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ নানাবিধ— স্কুলে পঠনপাঠনের মান খারাপ, রান্নায় তেল কম দিতে বলেন এবং অন্য।
এই প্রবণতার ছবি সামনে রেখেই এ বার প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকেরা— এই চটজলদি বিচারের ফলে সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কোন বার্তা যাচ্ছে? এ ভাবে শিক্ষক হেনস্থা আটকাতে এ বার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হস্তক্ষেপ দাবি করল প্রধানশিক্ষকদের সংগঠন অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেস। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বলেন, “শিক্ষকদের যে ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, তা আমাদের লজ্জা। শুধু শিক্ষা নয়, এই ঘটনা গোটা সমাজের উপর আঘাত। তাই মুখ্যমন্ত্রীকে ই-মেল করে অনুরোধ করেছি, যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়। না হলে, ‘ভয় আউট ভরসা ইন’ স্লোগানটাই তো ধাক্কা খাচ্ছে।”
আরও পড়ুন:
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চন্দন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করা হলেও বহু ক্ষেত্রে পুলিশ কার্যত দর্শক বলে তাঁর অভিযোগ। গত এক মাসে কী ভাবে শিক্ষকেরা আক্রান্ত হয়েছেন তা বিস্তারিত জানিয়েছেন ই-মেলে, এমনই দাবি তাঁর। তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা এই অসভ্যতা করেছেন, তাঁরা কোনও ভাবেই অভিভাবক হতে পারেন না। আইন হাতে তুলে নেওয়ার জন্য কঠোর শাস্তির প্রয়োজন। না হলে এই প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। শিক্ষক বা অন্য কোনও মানুষকে এ ভাবে হেনস্থা করা যায় না।’’
শিক্ষামহলের অভিযোগ, শুধু ডিম ছুড়ে ‘বিচার’ করার প্রবণতাই নয়, এক শ্রেণির মানুষ স্কুলে ঢুকে গোলমাল পাকানোর চেষ্টাও করছেন। চন্দন জানিয়েছেন, কোনও কোনও জেলা থেকে স্কুলে ঢুকে গোলমাল করার অভিযোগও এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে স্কুলে ঢুকে প্রধানশিক্ষকের কাছে আয়-ব্যয়ের হিসাবও চাওয়া হচ্ছে কোথাও কোথাও, চলছে চোখরাঙানি।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নাম হচ্ছে বলেই মনে করছেন শিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, কোনও স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা প্রশাসনিক ত্রুটির অভিযোগ থাকলে পুলিশ-প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। আইনের পথে বিচার হবে। কিন্তু তা না করে, একদল মানুষ ভয় দেখানো, প্রকাশ্যে অপমানের পথ বেছে নিচ্ছেন। এই ধরনের কাজ শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তিকেই আঘাত করছে বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতার একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক বলেন, “এ ভাবে কারও বিচার করে শাস্তি দেওয়াও আসলে একটি অপরাধ। দুর্বলের উপরে সবলের আক্রমণের বহিঃপ্রকাশই হল ডিম নিয়ে আক্রমণ বা হেনস্থা করা।’’ শিক্ষকদের প্রশ্ন, এ ভাবে বিনা বিচারে অপদস্থ হওয়ার পর তিনি ছাত্রছাত্রীদের পড়াবেন কী করে? বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “কোনও কোনও প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে হয়তো সঙ্গত অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সে জন্য তো আইন রয়েছে। বিচার জনতার হাতে তুলে নেওয়াটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই না।” তিনি মনে করেন এ বিষয়ে সরকারের কড়া পদক্ষেপ প্রয়োজন। এমনকি তাঁরা পাল্টা দাবিও তুলছেন, যাতে সরকারি ভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়।