বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ! কয়েক দশক আগে স্কুলপাঠ্য রচনায় এই বিষয়ে বিতর্ক খুবই পরিচিত ছিল। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে সেই বিতর্কই কিছুটা পরিমার্জিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মোবাইল আশীর্বাদ না অভিশাপ!’ উত্তর সেই একই— বিজ্ঞান বা মোবাইলের ব্যবহারের উপরেই নির্ভর করে তার চরিত্র।
গোটা দেশেই যখন পড়ুয়াদের মোবাইলের প্রতি আসক্তি ও ইন্টারনেটে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে, সেখানে ক্যালকাটা গার্লস হাইস্কুলের আইরিন মিত্র অনন্য নজির তৈরি করে ফেললেন। বৃহস্পতিবার আইএসসি-র ফল প্রকাশ হতে দেখা যায় সব বিষয়ে ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে আইরিন। জানা গেল কোনও গৃহশিক্ষকের সাহায্য তাঁকে নিতে হয়নি। স্কুলের পড়াশোনার পরে তাঁর কাছে জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যমই ছিল ইউটিউব এবং গুগল। মোবাইল বা ল্যাপটপের মাধ্যমেই তার মনের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁটিনাটি আয়ত্ত করে ইংরেজি সহ সেরা তিন বিষয়ে ১০০-এ ১০০ নম্বর পেয়ে নজির তৈরি করেছেন। অর্থাৎ ৪০০-এ ৪০০। মনের অনুসন্ধিৎসাই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি।
আইরিনের বাবা অর্ণব মিত্র মুর্শিদাবাদ মহকুমা হাসপাতালের শল্যচিকিৎসক। মা কবিতা মিত্রও চিকিৎসক। আইরিনের বোন ঈষাভী মিত্রও ক্যালকাটা গার্লস স্কুলেই পড়ে। দুই মেয়েকে দেখাশোনা করার জন্য নিজের সরকারি চাকরি ছে়ড়েছেন কবিতা। বর্তমানে ব্যক্তিগত ক্লিনিকে বসেন তিনি। বাড়িতে মেয়েদের পড়াশোনার ভার তার উপরেই।
অর্ণব বলেন, ‘‘মেয়ে ভীষণ বাধ্য। ওরা দু’জনেই আমাদের সঙ্গে ভীষণ সহযোগিতা করে। আমি সে ভাবে সময় পাই না। ওদের মা সবটা দেখে। মেয়েরাও খুব কথা শোনে।’’ মেয়ের এই সাফল্যে খুশি তাঁরা।
কিন্তু কী ভাবে গৃহশিক্ষক ছাড়াই ৪০০ তে ৪০০ পেলেন? আইরিন জানান, তিনি সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আগ্রহী। কেউ জোর করে তার উররে কিছুই চাপিয়ে দেয়নি। যে কারণে সব সময়েই জটিল অঙ্কের সমাধান করতে বাড়তি আগ্রহ পেয়েছেন। রাত জেগে শুধু অঙ্কের সমাধান করতে পছন্দ করেন তিনি। সে কারণেই আইএসআই কলকাতা থেকে ডেটা সায়েন্স নিয়ে পড়়াশোনা করতে চান। মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
আইরিন বলেন, ‘‘চ্যাটজিপিটি কী ভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে সেটা ভিতরে ঢুকে জানতে ইচ্ছা করে। তার পর সেই প্রযুক্তির সুবিধা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই সার্থকতা।’’ বাবা মা দু’জনেই চিকিৎসক। তা হলে চিকিৎসক না হয়ে প্রযুক্তির বিষয়ে আগ্রহ কেন? আইরিনের উত্তর, ‘‘বাবা মায়ের থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েই তো সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। আমি চাই নতুন প্রযুক্তির সুবিধা দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছে যাক।’’ স্কুল থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান আইরিন।
ইন্টারনেটকে তিনি নিজের পড়াশোনার কাজে লাগিয়েছেন। ইউটিউব থেকে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের নানা বিষয়ের উপরে জ্ঞান অর্জন করেছেন। ছোট থেকেই সব সময়ে নতুন কিছু জানতে চাইতেন তিনি। আইরিন বলেন, ‘‘কোনও বই পেলেই আগে পুরো পড়ে ফেলতাম। ভাবতাম বইটা পড়ে শেষ করতে পারলেই আমি অনেক কিছু জানতে পারব।’’ যদিও ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েও আাইরিনের বক্তব্য, ‘‘আমি বিখ্যাত হতে চাই না। সাফল্যের শীর্যেও যেতে চাই না। আমি শুধু চাই সমাজ যেন আমার থেকে ভাল কিছু পায়। সেখানেই আমার সার্থকতা।’’