গঙ্গার দু’পাশের শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিনে বন্ধ হয়েছে একের পর এক চটকল। সোমবার সেই তালিকায় নাম উঠল উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটির নদিয়া চটকল এবং শ্যামনগরের ওয়েভারলি চটকলের। শ্রমিক দিবসেই বন্ধ হয়েছিল ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের কাঁকিনাড়া চটকল ও নফরচাঁদ চটকল। তার পর দিনই হুগলির ভদ্রেশ্বরে ভিক্টোরিয়া চটকলের গেটে তালা পড়েছে। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন কাঁকিনাড়ার রিলায়েন্স চটকলে। বন্ধ হয়েছে ভদ্রেশ্বরের আরেকটি চটকল নর্থ শ্যামনগরও। এর ফলে ব্যারাকপুর ও হুগলি শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে গত এগারো দিনে আটটি চটকল বন্ধ হওয়ায় কর্মহীন হলেন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক। পরিবারের সদস্য মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় এক লক্ষ। শুধুমাত্র এ দিন দু’টি চটকল মিলিয়ে কার্যত বিনা নোটিসে কাজ হারিয়েছেন প্রায় সাত হাজার শ্রমিক।
এ দিন উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটির নদিয়া জুট মিলে ‘সাসপেনসন অব ওয়ার্ক’-এর নোটিস টাঙিয়ে দিলেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। এর ফলে কর্মহীন হয়ে পড়লেন ওই কারখানার প্রায় তিন হাজার শ্রমিক। চটকল বন্ধের কারণ হিসাবে ইতিমধ্যেই কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে কারখানা চত্বর সরগরম হয়ে ওঠে। গণ্ডগোলের সূত্রপাত হয় রবিবার শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার সময়। উৎপাদনে ঘাটতি দেখিয়ে গত কাল শ্রমিকদের পারিশ্রমিক কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এর জেরে শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েও কারখানার গেটের বাইরে চলে যান। তবে কারখানায় নোটিস ঝোলালেও কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দেননি বলে জানা গিয়েছে। গত কয়েক বছরে একাধিকবার বন্ধ হয় নদিয়া চটকল। চটকল কর্তৃপক্ষের দাবি, শ্রমিকেরাই এ দিন কাজ বন্ধ করেছেন। অন্য দিকে, বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থ অবিলম্বে তাঁদের ফেরত দিতে হবে বলে দাবি করেছে শ্রমিক পক্ষ। তাঁদের অভিযোগ, অতিরিক্ত উৎপাদনের বোঝা চাপিয়ে কর্তৃপক্ষ আসলে কারখানা বন্ধের চক্রান্ত করছে।
ওয়েভারলিতে চাহিদা না থাকা-সহ লোকসান, শ্রমিক সমস্যা— এমন বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে কারখানা বন্ধ করেছেন কর্তৃপক্ষ। ভাটপাড়ার তৃণমূল বিধায়ক তথা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের চটকলগুলির আইএনটিটিইউসি নেতা অর্জুন সিংহ বলেন, ‘‘সত্যিই অবস্থাটা খুব উদ্বেগের। আচমকা কাজ হারালে শ্রমিক অসন্তোষ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যে ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্রান্ত নীতির ফলে চটশিল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে তাতে সামনে যে ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি হবে সেটা সকলের বোঝা উচিত।’’
ঘটনার কথা শুনে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের কংগ্রেস নেতা সম্রাট তপাদারের প্রশ্ন, ‘‘তৃণমূলের সাংসদেরা এখানে শ্রমিক দরদের নাটক না করে পার্লামেন্টে কি এক বারও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন? ব্যারাকপুরের সাংসদ গত ছয় বছরে এক বারও চটশিল্পের প্রসার ও শ্রমিকদের জন্য কোনও দাবিতে সোচ্চার হননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ দিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলিকে একজোট হয়ে আন্দোলনে নামার ডাক দিয়েছে সিটু। সিটু-র রাজ্য কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গার্গী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘প্রমোটারির থাবা পড়েছে চটকলগুলিতে। গোটা বিশ্বের মধ্যে যে শিল্পটার জন্য গঙ্গাপারের দুই শিল্পাঞ্চল টিকে আছে সেই চটশিল্পকে ধ্বংস করছে প্রমোটারিরাজ। মালিকেরা একসঙ্গে বেশি মুনাফার লোভে কারখানা গুটিয়ে নিতে চাইছে। স্থায়ী শ্রমিকদের বসিয়ে দিয়ে ঠিকা শ্রমিক দিয়ে কোনও রকমে মিল চালাচ্ছে। যাতে রাতারাতি দায় এড়িয়ে মিল বন্ধ করে দেওয়া যায়।’’
এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ সরাসরি মুখ খুলতে চাননি। দু’টি চটকলেই শ্রমিক বিক্ষোভের আশঙ্কায় পুলিশ পিকেট বসেছে।
ছবি: সজল চট্টোপাধ্যায়।