সারদা মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত কুণাল ঘোষ এ বার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতারের দাবি জানালেন। এর আগে নানা সময়ে দলের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে তোপ দেখেছেন তৃণমূলের সাসপেন্ড হওয়া এই সাংসদ। এমনকী, মুকুল রায় বা মুখ্যমন্ত্রীও তাঁর নিশানা থেকে বাদ যাননি। কিন্তু, দলনেত্রীকে গ্রেফতারের আর্জি এই প্রথম বার শোনা গেল তাঁর মুখে। কুণালের পথে হেঁটে তৃণমূলের আর এক প্রাক্তন নেতা আসিফ খানও ইদানীং দলের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করেছেন। মমতাকে তিনি ‘ডাকাতরানি’ও বলেছেন। কিন্তু তাঁকে সরাসরি গ্রেফতারের কথা বললেন সেই কুণালই।
সারদার সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল টেন’ সংক্রান্ত পার্ক স্ট্রিট থানার একটি মামলায় সোমবার কুণালকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে হাজির করানো হয়। শুনানি শেষে দুপুর দেড়টা নাগাদ কোর্ট লক-আপ থেকে বেরিয়ে পুলিশের গাড়িতে ওঠার মাঝে কুণাল বলেন, “সারদা কেলেঙ্কারিতে যিনি সব থেকে বেশি সুবিধা নিয়েছেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হোক। মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হোক।” কুণালের কথা যাতে শোনা না যায়, সে জন্য ‘প্রথা’ মতো ‘হা-রে-রে’ আওয়াজে এ দিনও ব্যস্ত ছিল কলকাতা পুলিশ। পেটানো হয় গাড়িও। তবে, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতারের দাবি জানাতেই মুখ আটকাতে কুণালের গলা টিপে ধরতেও এ দিন দেখা যায় পুলিশকে। শুধু গলা টিপেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। তাঁকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলা হয়। আদালত চত্বরে হাজির হওয়া সংবাদমাধ্যমের কর্মীদেরও এ দিন মারধর করে পুলিশ।
এ দিন কোর্ট লক-আপ থেকে বেরিয়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যান কুণাল। তার পরেই বলতে থাকেন, “আমাকে হেনস্থার জন্যই মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছেন।” এই সময়েই কুণালকে আড়াল করতে শুরু করে পুলিশ। তাঁকে টেনে নামিয়ে আনা হতে থাকে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়ির দিকে। গাড়ির সামনে এসে হঠাৎই পাদানিতে বসে পড়েন কুণাল। বলতে থাকেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হোক।”
পাদানিতে বসা থেকেই পুলিশকর্মীরা কুণালের হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। সেই হ্যাঁচকা টানের সামনে মরিয়া কুণাল আঁকড়ে ধরেন গাড়ির হাতল। মুখ্যমন্ত্রীর নাম তাঁর মুখ থেকে বেরনো মাত্রই পিছন থেকে হাত দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন এক পুলিশকর্মী। জোর করে টেনে গাড়িতে তোলা হতে থাকে কুণালকে। দেহের অর্ধেকটা গাড়ির ভিতরে যাওয়ার পরেই পা দু’টো ধরে তুলে কার্যত গাড়ির ভিতরে ছুড়ে দেওয়া হয় তাঁকে। বন্ধ করে দেওয়া হয় গাড়ির দরজা।
রাজ্য সরকার ও পুলিশের বিরুদ্ধে এ দিন আদালতের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন কুণাল। পার্ক স্ট্রিট থানার ওই মামলায় সম্প্রতি সুদীপ্ত ও কুণালের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। এ দিন ব্যাঙ্কশাল আদালতের বিচারক শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে কুণাল বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই সারদা কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে। তা হলে কলকাতা পুলিশ এই মামলার আলাদা তদন্ত করছে কেন?” তাঁর অভিযোগ, প্রতিহিংসা মেটাতেই রাজ্য সরকার এ ভাবে শাস্তি দিতে চাইছে।
কুণালের আইনজীবী অয়ন চক্রবর্তী জানান, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর জন্য বিচারক সেটিকে নগর দায়রা আদালতে পাঠিয়েছেন। আগামী ১২ ডিসেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি।
সারদা কেলেঙ্কারিতে সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ার পর আদালত চত্বরে বার বারই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন কুণাল। মমতাকেও নিশানা করেছেন বেশ কয়েক বার। যেমন, গত ৬ সেপ্টেম্বর সিবিআই আদালতে তিনি দাবি করেছিলেন, সারদা মিডিয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সুবিধা সবচেয়ে বেশি কেউ যদি পেয়ে থাকেন, তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার পুজোর আগে পঞ্চমীর দিন তিনি বলেন, “যাঁরা সারদার কাছে সুবিধা নিয়েছেন, তাঁরা বাইরে পুজো উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন। আর আমি জেলে বসে ঢাকের আওয়াজ শুনব, এটা হতে পারে না।” এর পরে গত ১০ নভেম্বর তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেন। ওই দিন তিনি ভরা আদালতে জানান, তিন দিনের মধ্যে রাঘব বোয়ালরা ধরা না পড়লে আত্মহত্যা করবেন তিনি। দিনের হিসেব মেনে তিন দিন পেরনোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তাঁকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
সারদা কাণ্ডে সিবিআই তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা তথা উত্তরপ্রদেশে দলের প্রাক্তন পর্যবেক্ষক আসিফ খানকে জেরা শুরু করতেই দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তোপ দাগেন তিনি। মমতাকে ‘মিথ্যেবাদী’ও বলেন। পরে জমি সংক্রান্ত প্রতারণা মামলায় আসিফকে গ্রেফতার করে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট। এর পরে বেশ কয়েক বার আদালত চত্বরেই মুখ খোলেন তিনি। বারাসত আদালতে তিনি সম্প্রতি বলেছিলেন, “রাম-সীতা ঘুরে বেড়াচ্ছে, হনুমান হাজতে।” এর কয়েক দিন পরেই ওই মামলায় তাঁকে উত্তরপ্রদেশে নিয়ে যায় পুলিশ। সেই সময় বিমানবন্দরে ঢোকার মুখে সারদার টাকা কে নিয়েছে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, “ডাকাতরানির দলের সবাই নিয়েছে।’’ ডাকাতরানি কে? আসিফ কোনও রাখঢাক না করে সরাসরি জানিয়ে দেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।” কিন্তু, তিনিও সরাসরি মমতাকে গ্রেফতারের দাবি জানাননি।