দর্শক সিনেমাহলমুখী হচ্ছে না। উৎসবের সময় এক গুচ্ছ ছবিমুক্তি। বাকি সময় নতুন ছবি মুক্তি দিতে ভয় পাচ্ছেন প্রযোজকেরা। কারণ, হাতেগোনা কিছু ছবি ছাড়া বেশির ভাগ ছবিই দর্শক টানতে ব্যর্থ।
কেন ক্রমশ সিনেমাহল থেকে মুখ ফেরাচ্ছে দর্শক? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ দায়ী করছেন, ছবির গল্পকে। কেউ আঙুল তুলছেন নতুন ভাবনার অভাবের দিকটিকে। এরই মধ্যে আবার একটা বড় অংশ দায়ী করছেন সমাজমাধ্যমে তারকাদের নিত্য আনাগোনা বা অতিসক্রিয়তাকে। সিনেবোদ্ধাদের একটা অংশের বক্তব্য, পাড়ার কোনও ব্যক্তি, চেনা বা অচেনা কোনও মানুষ সমাজমাধ্যমে এসে আজকাল নানা ধরনের ইউটিউব বা রিল বানাচ্ছেন যে কোনও ‘কনটেন্ট’ নিয়ে। সেটাই রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাঁদের ‘রিচ’ বাড়ছে হু-হু করে। ব্লগাররা নিত্য ব্লগ করছেন নানা বিষয় নিয়ে। এখন ওই একই পথে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে রুপোলি পর্দার তারকাদের একটা বড় অংশকেও। তাঁদের খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো, ব্যক্তিগত বা সামাজিক কোনও বিষয় নিয়ে তাঁদের অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা হয়ে তাঁদের অন্দরের আনাচকানাচ বন্দি হচ্ছে সমাজমাধ্যমে। আর সেটাই ঘরে বসে তো বটেই, ট্রেনে-বাসে বা মেট্রোর ভিড়ের মধ্যেও লোকজন মোবাইলে দেখছে। প্রতি দিন।
সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, পাড়ার পরিচিত কোনও মহিলা বা বন্ধুর মতো সমাজমাধ্যমে যদি বিনা পয়সায় রুপোলি পর্দার তারকাদের দিনভর দেখা মেলে, তা হলে টিকিট কেটে তাঁদের দেখতে দর্শক হলে যাবে কেন? যাঁরা সরাসরি এই দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তেমনই কিছু খ্যাতনামীর সঙ্গে আনন্দবাজার ডট কম কথা বলেছিল। তালিকায় পরিচালক অরিন্দম শীল, অভিনেতা-প্রযোজক দেব, নুসরত জাহান, প্রযোজক রানা সরকার, অভিনেতা ঋতাভরী চক্রবর্তী, সোহম মজুমদার এবং গায়িকা অন্তরা মিত্র।
অরিন্দম, রানা সমাজমাধ্যমের রমরমার আগের যুগের মানুষ। আবার এখনকার যুগকেও দেখছেন। দেব-নুসরত-অন্তরাও কিছুটা। এই প্রজন্মের প্রতিনিধি ঋতাভরী-সোহম।
অভিনেত্রী-পরিচালক-রাজনীতিবিদ শতাব্দী রায়। ছবি: ফেসবুক।
আলোচনার শুরু শতাব্দী রায়ের বক্তব্য দিয়ে। পেশায় অভিনেতা-পরিচালক-রাজনীতিবিদ সম্প্রতি একটি কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান করেছিলেন। তার আগে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এই বিষয়টি নিয়েও মতামত দিয়েছিলেন। শতাব্দীও খুশি নন ‘ছায়া জগতের মানুষ’দের এত ঘন ঘন প্রকাশ্যে আসা নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, তখন তারকারা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে সহজলভ্য ছিলেন না। তাঁদের দেখতে সিনেমাহলে যেতে হত, মনে করান শতাব্দী। তাঁর কথায়, ‘‘এখন তো সমাজমাধ্যমের যুগে যেখানে-সেখানে তারকাদের দেখা যায়। আলাদা করে ছবি হিট হওয়ার দরকার পড়ে না জনপ্রিয় হওয়ার জন্য। ফলে ছবি হিট করানোর জন্য আলাদা করে ভাবতে হয়।’’ তারকাকে যদি বাজারে যেতে দেখা যায়, রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায়, তবে তাঁকে পর্দায় দেখার দরকার কী? প্রশ্ন ছুড়ে দেন বছরের পর বছর ম্যাটিনি শো ভরিয়ে রাখা তারকা। তিনি বলেন, ‘‘এখানে তো আর কোনও রজনীকান্ত নেই, বাংলা ছবি চলবে কী করে? তেমন স্টার থাকলে আলাদা কথা। তাঁকে যেমনই দেখতে লাগুক, লোকে ছুটে আসবে। আর না হলে ছবি খুব ভাল হতে হয়।’’
আরও পড়ুন:
শতাব্দী এখনও সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসী, যে বিশ্বাসে পেট্রল পাম্পে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে ধমকেছিলেন উত্তমকুমার। উত্তম সে দিন তাঁকে সাবধান করেছিলেন, “তোমাকে যদি এমনিতেই হাটে-বাজারে লোকে দেখতে পায় তা হলে সিনেমাহলে যাবে কেন?” প্রায় এই কথাটাই তাঁর মুখে সংলাপ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর ‘নায়ক’ ছবির নায়ক অরিন্দম চ্যাটার্জি সাংবাদিক অদিতিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমরা ছায়ার জগতের মানুষ তো, কাজেই আমাদের বেশি কথা বলতে নেই। তা হলে পাবলিকের কাছে আমাদের ইমেজ নষ্ট হয়ে যায়।” অর্থাৎ, বাস্তবে নিজের ব্যক্তিগত বা সাধারণ রূপ দর্শকদের সামনে তুলে ধরলে রুপোলি পর্দার নায়কের ‘ম্যাটিনি আইডল’ বা ‘স্টার’ ইমেজ ধুলোয় লুটোবে। উত্তমকুমার ব্যক্তিগত জীবনেও খুব কড়া ভাবে এই নিয়ম মানতেন।
অভিনেতা-প্রযোজক-সাংসদ দেব। ছবি: ফেসবুক।
এই মুহূর্তে বাংলা ছবির পয়লা নম্বর নায়কের আসনে দেব। সাংসদ-অভিনেতা কি তাঁর অনুরাগীদের থেকে নিজেকে দূরে রাখেন? ছবির বিশেষ প্রদর্শনীতে তো বটেই, অন্যান্য অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়। আবার সমাজমাধ্যমে তিনি যে একেবারে নেই তা-ও নয়। তিনি কী বলছেন? অভিনেতা-প্রযোজক-সাংসদের উপলব্ধি, “খেয়াল করে দেখবেন, সমাজমাধ্যমে আমি কিন্তু ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা রিল খুব কমই দিই। বেশি দিই আমার কাজ বা ছবি প্রসঙ্গ। আর থাকে কিছু রাজনৈতিক প্রচার। এর জন্য দর্শক হলে আমায় দেখতে আসবেন না, এমনটা মনে করি না। তা হলে তো ‘প্রজাপতি ২’ দেখতে কেউ আসত না!” তাই দেব মনে করেন, ছবির গল্প যদি ভাল হয়, তা হলে দর্শক হলমুখী হবেনই। সেখানে নায়ক-নায়িকা সমাজমাধ্যমে কতটা মুখ দেখালেন, সেটা নিয়ে দর্শক মাথা ঘামাবেন না।
অভিনেত্রী-প্রযোজক নুসরত জাহান। ছবি: ফেসবুক।
দেবের থেকে সমাজমাধ্যমে তুলনায় বেশি দেখা যায় নুসরতকে। কখনও সেখানে থাকে সপরিবার বেড়ানোর ছবি। কখনও তাঁর আর যশ দাশগুপ্তের একান্ত মুহূর্তে। শরীরচর্চা বা পোষ্যের সঙ্গে সময় কাটানোর ছবিও জায়গা করে নেয়। অনেক ‘বিশেষ’ অনুভূতি বা বক্তব্য বা বার্তাও তিনি ভাগ করে নেন সমাজমাধ্যমে। নুসরত কি তা হলে তাঁর আকর্ষণ খুইয়েছেন? গত বছর পুজোয় মুক্তি পাওয়া ‘রক্তবীজ ২’তে তিনি একটি আইটেম গানের সঙ্গে নেচেছিলেন। সিনে সমালোচকদের দাবি, নুসরতকে আইটেম গানে দেখার জন্য দর্শকের কিন্তু আগ্রহ ছিল। সেই রেশ তাঁর কথাতেও। নুসরতের দাবি, “ছবির আকর্ষণ শুধুই নায়ক-নায়িকা নন। ছবির গল্পও। চিত্রনাট্য ভাল হলে অভিনয় ভাল হবে। তার টানে দর্শক হলমুখী হবেন।” তিনি এও জানিয়েছেন, তাঁর অনুরাগীরা সমাজমাধ্যমে দেখার পরেও তাঁকে সিনেমাহলে দেখতে যান।
অভিনেতা-পরিচালক-প্রযোজক অরিন্দম শীল। ছবি: ফেসবুক।
দুই প্রজন্মের সাক্ষী পরিচালক অরিন্দম শীল। তিনিও শুরুতেই উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ টেনেছেন। বলেছেন, “সেই সময় গাড়িতে কালো কাচের ব্যবস্থা ছিল না। হয় তাঁর মুখে খবরের কাগজের আড়াল থাকত, না হলে গাড়ির জানলায় পর্দাপ্রথা। সেই উত্তমকুমার যখন প্রিমিয়ারে যেতেন, তখন ‘গুরু’ ‘গুরু’ ধ্বনিতে কান পাতা দায়। এ কথা উত্তমবাবুর সেক্রেটারি রবি রায়চৌধুরী বলেছিলেন।”
সেটা ছিল একটা সময়। অরিন্দমের মতে, সেই সময় নায়ক বা নায়িকা যেন ঈশ্বরতুল্য, অধরা।
পরিচালকের মতে সেই ‘প্যাটার্ন’-এ এখনকার বিনোদনদুনিয়া চলে না। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে অরিন্দমের যুক্তি, “জাহ্নবী কপূর, দীপিকা পাড়ুকোন হয়ে অমিতাভ বচ্চন— প্রায় প্রতি দিন নিয়ম করে সমাজমাধ্যমে হাজিরা দেন। তা হলে কি বচ্চন বা দীপিকার ছবি দর্শক হলে দেখতে যান না? এই বদল মানতে হবে।” পাশাপাশি আরও একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। অরিন্দম বলেন, এই প্রজন্ম বাংলা ছবিই দেখতে চায় না। ফলে, তাদের মধ্যে নতুন ছবির কথা ছড়িয়ে দিতে সমাজমাধ্যমের আশ্রয় নিতেই হয়। এবং অভিনেতারাও তখন রিল বানিয়ে তাঁদের কাজের কথা প্রচার করেন। পরিচালক সেই সঙ্গে এটাও জানিয়েছেন, অভিনেতারা সমাজমাধ্যমের সঠিক ব্যবহার করছেন কি না, সেটাও দেখার। মুম্বইয়ে নতুন ছবিমুক্তির আগে প্রত্যেক তারকা নিজের সমাজমাধ্যমে সেই ছবির হয়ে বলেন। শুভেচ্ছা জানান। প্রচার করেন। এ দিকে, সহ-অভিনেতা বা সহ-প্রযোজকের ছবিমুক্তিতে বাগ্যুদ্ধে মাতেন বাংলার চলচ্চিত্রের সদস্যেরা! আফসোস অরিন্দমের।
প্রযোজক রানা সরকার। ছবি: ফেসবুক।
সমাজমাধ্যম ইদানীং উপার্জনের হাতিয়ারও। শুধু ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যের উপরে নির্ভর না করে সমাজমাধ্যম থেকেও উপার্জন করেন তারকারা। তাই তাঁদের এত রিলের রমরমা। সেই রিলের অনুসরণকারীর সংখ্যা তাঁকে নাকি নতুন কাজ পেতেও সহযোগিতা করে? প্রযোজকেরা নাকি সমাজমাধ্যমে অনুসরণকারীর সংখ্যা দেখে ছবির জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছেন? প্রশ্ন ছিল প্রযোজক রানা সরকারের কাছে। তাঁর সাফ জবাব, “সমাজমাধ্যমে নায়ক বা নায়িকার বেশি সংখ্যক অনুসরণকারী থাকলে সেটা ছবির প্রচারে সাহায্য করে মাত্র। যদিও তাকে খুব সংখ্যক অভিনেতা সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারেন। আমরা বরং সে রকম অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে বাছি, যাঁকে সমাজমাধ্যমে তুলনায় কম দেখা যায়। কারণ, যিনি যত বেশি পর্দার বাইরে দেখা দেবেন, তাঁকে পর্দায় দেখার আগ্রহ তত কমবে দর্শকদের।”
অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তী। ছবি: ফেসবুক।
ছোটপর্দা দিয়ে যাত্রা শুরু অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তীর। সে সব ছাপিয়ে নায়িকার এখন বড়পর্দা, সিরিজ়ে নিত্য আনাগোনা। ঋতাভরীর কথায়, “রণবীর কপূরের সোশ্যাল মিডিয়াতেই নেই। আলিয়া ভট্ট যা ভাগ করে নেন, সেটুকুই। তাতে কি রণবীরের প্রত্যেকটা ছবি হিট? আবার রণবীর সিংহকে দেখুন। বৌ দীপিকার সঙ্গে খুনসুটিটাও ‘পাবলিক’ করেন। তা হলে তো ওঁর ছবি দর্শকের দেখার কথাই নয়। এবং ‘ধুরন্ধর’ হিট হওয়ার কথা নয়। ‘ধুরন্ধর ২’-ও আসার কথা নয়।” নায়িকাও মনে করেন, ছবির গল্প, টানটান চিত্রনাট্য, অভিনব বিষয় পেলে দর্শক চেটেপুটে দেখেন, আজও।
সেই জন্যই ‘বহুরূপী’র মতো ছবি ব্লকবাস্টার হয় বলে দাবি ঋতাভরীর। তাঁর কথায়, “আমি, কৌশানী, আবীরদা, শিবুদা মারাত্মক ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছিলাম। তাতে ছবির আকর্ষণ আরও বেড়ে গিয়েছিল। ‘বহুরূপী’ দর্শক একাধিক বার দেখেছিলেন। গল্প, সকলের অভিনয় আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার— এই ত্রয়ীর কিন্তু ছবি হিট করানোয় বিশেষ ভূমিকা ছিল।”
অভিনেতা সোহম মজুমদার। ছবি: ফেসবুক।
অভিনেতা সোহম মজুমদারের যুক্তি একটু অন্য রকম। তাঁর বক্তব্য, একটি সিনেমা পরে ওটিটি বা মুঠোফোনেও দেখা সম্ভব। করোনাকাল থেকে সেই রেওয়াজ চালু হয়েছে। দর্শক এখন তাতেই বেশি অভ্যস্ত। তবে তিনি অভিনেতাদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতাকে অযথা কাঠগড়ায় তুলতে রাজি নন।
অভিনেতাদের মতো সঙ্গীতদুনিয়ার খ্যাতনামীরাও এখন সমাজমাধ্যমে সক্রিয়। তাঁদের কণ্ঠ, তাঁদের গান সেখানে শোনা যায়। যেমন, শ্রেয়া ঘোষালকে বিভিন্ন গানের রিয়্যালিটি শো-তে দেখতে পাচ্ছেন সবাই। সেই সব মুহূর্তে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। একই ভাবে তাঁর গাওয়া গানের মুহূর্তগুলোও। প্রসঙ্গ তুলতেই অন্তরা মিত্র বললেন, “শ্রেয়া নিজে সারা ক্ষণ সমাজমাধ্যমে থাকেন না। তাঁর গানের পুরো অংশটাও শোনা যায় না। তাঁর অনুষ্ঠান দেখতে গেলে এখনও টিকিট কেটে সভাগৃহ বা মঞ্চের সামনে উপস্থিত থাকতে হয়। বাকি গায়ক-গায়িকাদের ক্ষেত্রেও তা-ই।”
অন্তরা এখনও সমাজমাধ্যমে তারকাদের নিত্য আনাগোনা প্রসঙ্গে পুরনোপন্থী। গায়িকার ব্যঙ্গ, “এমনিতেই ব্লগার, ইউটিউবাররা ইদানীং মৃত্যুর দৃশ্য বা আত্মহননের চেষ্টার মতো ঘটনাও ‘মনোরঞ্জনের উপকরণ’ হিসাবে সমাজমাধ্যমে তুলে ধরছেন! সাধারণ মানুষের তাতে বিনোদন হচ্ছেও। এ বার তারকারাও যদি ‘এন্টারটেনমেন্ট’ দিতে সমাজমাধ্যমে ফি-দিন হাজিরা দেন, তা হলে তো ষোলোকলা পূর্ণ!”