আমার বাবা (গৌতম বসু) ‘নাটের গুরু’ বলে একটা ছবির শিল্প নির্দেশক ছিলেন। সেখানেই বাবা প্রথম দেখেন কোয়েলদির অভিনয়। বাড়ি এসে বলেছিলেন, “রঞ্জিতদার মেয়ে অনেক দূর যাবে দেখিস, স্পার্ক আছে।” সেইদিনই প্রথম বার কোয়েলদির নাম শুনলাম। তখনও জানতাম না উনি এত বড় একজন তারকা এবং শিল্পী হয়ে উঠবেন পরবর্তীকালে। জানতাম না, কোয়েলদির হাত ধরেই আমার বড়পর্দায় পরিচালনায় আসা হবে প্রথম।
কোয়েল মল্লিকের প্রথম অভিনীত ছবি ‘নাটের গুরু’র পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত।
এর পরে ছোটবেলাতেই, মায়ের লেখালেখির কাজের সূত্রে, অনেক বার কোয়েলদির গল্ফগ্রিনের বাড়িতে গিয়েছি। আমি তখন ছোট। আমরা একই পাড়ায় থাকতাম। সাইকেল চালিয়ে ওদের বাড়িতে গিয়ে কত বার লেখা দেওয়া-নেওয়া করেছি। দীপা (কোয়েলের মা) আন্টির সঙ্গেই মূলত দেখা হত তখন। আমার মা তখন সাংবাদিক। কোয়েলদিকে নিয়ে সেই সময় নানা সাক্ষাৎকার, স্টোরি করেছেন। মায়ের কাছ থেকেও শুনেছি, “কোয়েল খুব ভাল মেয়ে। মনটা খুব ভাল।”
সময়টা তখন ২০১৫ কি ২০১৬। সেই সময়ে আমার গুরু কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করছি। কাজের সূত্রে, শুটিংয়েই প্রথম আলাপ হয় কোয়েলদির সঙ্গে। আর প্রথম আলাপে নির্দ্বিধায় একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির দার্জিলিংয়ে শুটিং করাটা তো নিছক আরামদায়ক নয়! প্যাকআপ হয়ে গেলে কোয়েলদির ঘরে যেতাম আড্ডা মারতে। তখনই দেখেছি কোয়েলদির নিয়মানুবর্তিতা, সময়সচেতনতা। যে কোনও মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারেন। কোয়েলদির এই গুণ আমাকে খুব আকর্ষণ করে।
আরও পড়ুন:
দার্জিলিংয়ে কেভেন্টার্স বা কোনও এক রেস্তরাঁয় (ঠিক মনে নেই কোথায়) বসে কোয়েলদি আমাকে প্রথম বার জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি নিজের কিছু কেন ভাবছ না? নিজে পরিচালনা করবে কবে?” আমার কিন্তু মনে হয় না আমি এমন কোনও এলেম ওঁকে দেখিয়েছি, যাতে উনি এই কথা জিজ্ঞেস করতে পারেন। পরিচালনায় আসার ইচ্ছে আছে, এই কথাও আমাদের মধ্যে তখনও হয়নি। কে জানে, হয়তো ভাগ্যই আমাদের একসঙ্গে কাজ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। এখন ভাবলে এটাই মনে হয়।
পরিচালক অন্নপূর্ণা এবং চিত্রনাট্যকার সদীপ ভট্টাচার্যের সঙ্গে কোয়েল। নিজস্ব চিত্র।
২০২৩-এর গোড়ার দিকে যখন প্রথম ‘স্বার্থপর’-এর ভাবনা নিয়ে আমি আর সদীপ ভট্টাচার্য (ছবির লেখক, চিত্রনাট্যকার) ওঁর কাছে যাই, তখন উনি কিন্তু প্রায় এক কথাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। গল্পটা একেবারে অন্য ধরনের বলে মনে হয়েছিল, তাই। তার পর লেখালেখি করতে লেগেছে প্রায় এক থেকে দেড় বছর। আমার ভাবনা, সদীপের ভাবনা, তার সঙ্গে কোয়েলদির ইনপুট মিলিয়ে একটা এমন চিত্রনাট্যে এসে আমরা পৌঁছোলাম, যেটা হাতে নিয়ে আর ফিরে তাকাতেই হয়নি।
কিন্তু চিন্তার বিষয় ছিল একটাই। আমি বয়সে ছোট। কোয়েলদির বোনেরই মতো। আমার কথামতো কি উনি কাজ করবেন? কতটা সমর্পণ করবেন? খুব অবাক হলাম এটা দেখে যে, শুটিংয়ে এসে কোয়েলদি নির্দ্বিধায় আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। অভিনয়ের মাপজোক থেকে শুরু করে কোথায় কী ছোট ছোট ভাবাবেগের টুকরো চাইছি— সবটা। আমি বলব, বেশিরভাগ সময়েই উনি আমার দিকে তাকিয়ে এক বার ইশারায় জিজ্ঞেস করতেন, “যেটা চেয়েছ, সেটাই হয়েছে তো?” এমনও হয়েছে, যখন শুটিংয়ের অন্য সমস্যার মধ্যে পড়ে আমি একটু বিচলিত। কোয়েলদি খুব স্নেহ করে ভ্যানে নিয়ে গিয়ে আমাকে শান্ত করেছেন, ঠিক ভাবে ভাবতে সাহায্য করেছেন।
সত্যি বলতে, এখন কোয়েলদির সঙ্গে নিছক কাজের সম্পর্কই যে শুধু আছে, তা আর বলতে পারি না। উনি আমার বন্ধুও বটে। আমার সঙ্গে, সদীপের সঙ্গে এ রকম অনেক আলোচনা হয় যা কাজের পরিধির বাইরে। তার থেকে বুঝতে পারি, পেশাদার আবরণের ও পারে মানুষটা আসলে খুবই ঘরোয়া। ছেলে-মেয়ে, বর, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, নিজের বাবা-মা— এঁদেরকে নিয়ে ওঁর ছোট্ট সুন্দর একটা পৃথিবী আছে। সবার আগে পরিবার। তারপর বাকিটা।
বাবার আদরের মেয়ে কোয়েলের কাছে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: সংগৃহীত।
একই সঙ্গে উনি কিন্তু কাজ পাগল মানুষ। অথচ কী নিপুণ ভাবে কাজের মধ্যেও নিজের পরিবারের জন্য সময় বার করতে পারেন, এটাই আশ্চর্যের। এই জন্যেই উনি স্পেশাল। সব থেকে বড় কথা, হয়তো পাঁচ রকমের জিনিস করছেন, কিন্তু প্রতিটা কাজ মন থেকে, নিষ্ঠাভরে করছেন। আমি মনে করি, যে কোনও মানুষ, যে জীবনে সাফল্য পেয়েছে, তাঁর মধ্যে সমতা বজায় রাখার ক্ষমতা থাকে। তার নিজের গুরুত্ব অনুসারে। সেটা ওঁর আছে। ওঁর কথাবার্তা, ওঁর ব্যবহারের মধ্যে সেই নম্রতা প্রকাশ পায়। আর সেই কারণেই উনি আজকে এই জায়গায়।
‘স্বার্থপর’ ছবিতে প্রথম বার স্বাধীন ভাবে কোয়েলকে পরিচালনা করেন অন্নপূর্ণা। ছবি: সংগৃহীত।
কোয়েলদির জন্মদিন উপলক্ষে এটাই কামনা করি, যেন নতুন নতুন কাজে আরও সফল ভাবে উত্তীর্ণ হন। নিজের পরিবার এবং কাজ নিয়ে উনি যেমন মেতে থাকেন, তেমনি থাকুন চিরকাল।