Advertisement
E-Paper

‘অনুপম তখন প্রতিষ্ঠিত, তবু বাচ্চাদের মতো সারেগামা রেওয়াজ করত, ও আরও ভাল কাজ করুক এটাই প্রার্থনা’

২৯ মার্চ অনুপম রায়ের জন্মদিন। বিশেষ দিনে ব্যক্তি অনুপম, ছাত্র অনুপম, শিল্পী অনুপমের হদিস দিলেন সরোদবাদক প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ১০:০৮
অনুপমের জন্মদিনে কলম ধরলেন সরোদবাদক প্রত্যুষ।

অনুপমের জন্মদিনে কলম ধরলেন সরোদবাদক প্রত্যুষ। ছবি: সংগৃহীত।

‘অটোগ্রাফ’ ছবির বিখ্যাত গান প্রথম শুনেছিলাম অনুপমের কণ্ঠে। ওই একটিই গান। তার বেশি ওর সম্পর্কে জানতাম না। ওকে চাক্ষুষও করিনি। ওর সঙ্গে প্রথম দেখা ২০১২ সালে আমেরিকার ন্যাশভিল শহরে, বঙ্গমেলায়। সে দিন অনুপমের গান ছিল, আমারও সরোদ বাজনা ছিল। আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম, সুদূর আমেরিকায় প্রেক্ষাগৃহে যত দর্শক-শ্রোতা ছিলেন তাঁরা অনুপমকে শুনতেই এসেছিলেন এবং সব গান শ্রোতাদের মুখস্থ। তাঁরাও অনুপমের সঙ্গে গাইছেন গান। সে দিন ওর জনপ্রিয়তা চাক্ষুষ করেছিলাম। সে দিন বুঝেছিলাম ওর জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে কোন দিকে যেতে পারে।

২০১২ সাল, ‘হেমলক সোসাইটি’ ছবির জন্য একটা গান তৈরি করে অনুপম। ‘আমার মতে তোর মতন কেউ নেই’ এই গানটির মহিলা কণ্ঠে গেয়েছিলেন লোপামুদ্রা মিত্র আর পুরুষ কণ্ঠে গেয়েছিলেন রূপঙ্কর বাগচী। দু’জনের গানেই আমার বাজনার প্রয়োজন। তখনই সেই ভাবে আলাপ হয় অনুপমের সঙ্গে। সবচেয়ে ভাল লেগেছিল এক জন অগ্রজ শিল্পীর কাছে ঠিক যে ভাবে এক জন নিজেকে আত্মসমর্পণ করে দেয়, সেই ভাবেই ও এসেছিল আমার কাছে। আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, ও ইমন রাগের ওপর গানটি বানিয়েছিল। আমি যত ক্ষণ বাজালাম ও সামনে বসেছিল। হয়ে যাওয়ার পর নিজে হাতে আমার সরোদটা ধরে আমার গাড়িতে তুলে দিল। তখনই অবাক হয়েছিলাম ওকে দেখে। গানবাজনার জগতে এই দৃশ্য খুবই বিরল। খুব একটা দেখাই যায় না। ওর শিক্ষাদীক্ষা, রুচি খুবই ভাল এবং আদ্যোপান্ত একটি ভাল ছেলে।

এর বেশ কিছু দিন পর হঠাৎই ফোন করে আমাকে বলে, “আমি তোমার কাছে গান শিখতে চাই।” শুনেই মনে হল, সর্বনাশ! বলেছিলাম, আমি তো গান শেখাই না। সরোদ বাজাই। তখন ও আবদারের সুরেই বলে, “আমি জানি তুমি শেখাও না । কিন্তু আমাকে অনেকে বলেছেন আমার যেটা দরকার, যে দিকগুলো দুর্বল বা খামতি সে সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়া প্রয়োজন। আমি বিরাট কিছু খেয়াল গায়ক হতে চাইছি না। কিন্তু আমার আরও গানবাজনা, রাগ সঙ্গীত, তাল সম্পর্কে আরও ধারণা প্রয়োজন। আরও কী কী শোনা উচিত আমার সেই সব পরামর্শ এখনই অন্য কারও কাছে আমি পাব না।” এত কিছু শুনে শেষ পর্যন্ত তখন রাজি হই। আসতে বলি আমার কাছে।

অনুপম আসার পর দেখলাম, ওর গান করাটা খুব সহজাত ভাবেই হয়। সত্যি সত্যি সে ভাবে শিখে, রেওয়াজ করে গান করেনি ও। সেই কারণেই হয়তো সেইসময় ওর গাওয়ায় কিছু খামতি ছিল। সেটা অনুপমকে বলায়, একবাক্যে তা স্বীকারও করল। ও একটা ইলেকট্রনিক তানপুরা কিনল। এর পর একেবারে বাচ্চা ছেলের মতো সারেগামা রেওয়াজ করতে শুরু করল। আমার যেটুকু গানের জন্য গলার ব্যায়াম জানা ছিল ওকে সেগুলো দিলাম। কিছু দিন পর ও সুন্দর করে তুলে নিয়ে এল। মনে রাখা দরকার, তখন অনুপম রায় প্রতিষ্ঠিত এক নাম। সেই সব তকমা ঝেড়ে ফেলেই ও আবার যেন শুরু থেকে শুরু করল একেবারে এক জন ছাত্রের মতো। শিল্পীর এই ভাবনাই আমাকে আরও ছুঁয়েছিল। আর সেই যে অভ্যাস, সেটা কিন্তু আজও বজায় রেখেছে। ব্যস্ততার জন্য যে সবসময় আসতে পারে তা নয়। কিন্তু যখনই আসে নিজেই আমার কাছে নতুন কিছু শিখতে চায়। নিজে থেকেই নতুন নতুন কাজ শিখতে চায়। কখনও পনেরো দিন, কখনও এক মাস অন্তর আমার কাছে আসে, এসে শুনিয়ে যায়। এতে আমার অবদান আদৌ কতটা আছে জানি না। কিন্তু ওর নিজের গান গাইবার ক্ষমতা, ওর কম্পোজ়িশনে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার যে প্রবণতা তা অনেকখানি আগের থেকে উন্নত হয়েছে। তাতে আমি তো খুবই খুশি হয়েছি। ওর অনুরাগীরা আরও বেশি খুশি বলেই মনে হয়।

বাচ্চা ছেলের মতো রেওয়াজ করতেন অনুপম!

বাচ্চা ছেলের মতো রেওয়াজ করতেন অনুপম! ছবি: সংগৃহীত।

একটা বড় বিষয় হল, ওর কিন্তু নয় নয় করে ১৫ বছর বা তার বেশিই হয়ে গেল বাংলা গানের জগতে। এত বছরেও ওর ধারাবাহিকতা, বা জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। এ সব কিছুর পরেও ও যা সিনেমায় করার সুযোগ পায় না, কিছু পরীক্ষামূলক গান করার চেষ্টায় থাকে। ওর মাথায় কী ঘুরছে, সেই সব বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করে। আমিও যতটুকু পারি ওকে পরামর্শ দিই।

আসল কথা হল, অনুপম অত্যন্ত মেধাবী এক ছাত্র।ও লেখাপড়াতেও ভাল। ও যেটাই ধরে সেটা একদম অন্তর দিয়ে করে। নিয়ম মেনে সেগুলো অভ্যাস করে। জীবনের শৃঙ্খলা বজায় রাখে। আমি এই বিষয়টার বিশেষ করে প্রশংসা করি। আমি সবাইকে বলি, এই ভাবে জীবন চালনা করতে পারলে তবে কিছু হবে।

জীবন শৃঙ্খলা মেনে যাপন করতে ভালবাসেন অনুপম।

জীবন শৃঙ্খলা মেনে যাপন করতে ভালবাসেন অনুপম। ছবি: সংগৃহীত।

সুজিত সরকারের ‘পিকু’ ছবিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা আজীবন মনে থাকবে। খুবই স্মরণীয় মুহূর্ত। ওর সুযোগ এসেছিল অমিতাভ বচ্চনের ছবিতে কাজ করার। সেটার গান এবং আবহসঙ্গীতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন অনুপম। কী ভাবে যেন একটা দুর্দান্ত সরোদের থিম বানিয়ে ফেলল, যা এত বছর পরেও সমান জনপ্রিয়। কেউ বাজিয়ে কেউ গেয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন। আমার কাছে তো এমনও অনেকের আবদার এসেছে, আমি সরোদ শিখতে চাই। আসলে আমি ‘পিকু’-র ওই বাজনাটা বাজাতে চাই। সরোদ শিক্ষা বা সেতার শিক্ষার বিষয়টা এখন ‘পিকু’র থিম বাজানোয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেটা এক দিক থেকে খুবই ভাল। কারণ নতুন প্রজন্ম বা নবীন প্রতিভারা যাঁরা হয়তো সেতার বা সরোদের দিকে ঝোঁকেনি তাঁরাও হয়ত ভাবছেন যে, এই যন্ত্রগুলো বাজানো যেতে পারে। সেটা অনুপমের জীবনের একটা বড় কাজ বলে আমার মনে হয়। কারণ, আমাদের দেশে যে ভাবে আবহসঙ্গীত তৈরি হয়, খুব বেশি তা মনে থাকে না। কোনও সিনেমার নাম করে যদি থিমটা জানতে চাওয়া হয়, আমরা কিন্তু পারব না। দু’একটা ছবির থিম হয়তো আগেও হয়েছিল যা সকলের মনের মণিকোঠায় রয়ে গিয়েছে, এখনও হয়তো থাকছে। তবে তার মধ্যে ‘পিকু’-র থিম অন্যতম। এটা অনুপমের জীবনের একটা বিরাট কাজ। এবং তার সঙ্গে আমিও যুক্ত থাকতে পেরে আমারও একটা স্মরণীয় কাজ।

আশা করি, অনুপম ভবিষ্যতে আরও এমন আরও অনেক ভাল কাজ করবে। তার মধ্যে আমি শামিল থাকি বা না থাকি, ওর সঙ্গে ওর পিছনে আমি সবসময়ই আছি। আমার সব শুভেচ্ছা, ভালবাসা ওর জন্য রয়েছে। ২৯ মার্চ অনুপমের ৪৪তম জন্মদিনে আমার আন্তরিক ভালবাসা রইল ওর জন্য। ও ভাল থাকুক, সুস্থ থাকুক এবং জীবনে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক।

Tollywood Singer
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy