মুনমুন সেন আমাদের কাছে একটা ‘মিথ’ ছিল। সুচিত্রা সেনের মেয়ে, কেমন হবে? সেটা নিয়ে একটা আগ্রহ ছিল বটে। সেই সময় ওর অল্প কিছু ছবি দেখেছিলাম, কারণ তখনও মুনমুন খুব একটা পরিচিতি পায়নি। তাই মুনমুন আমাদের কাছে যেন এক রহস্যময়ী ছিল। শুধু জানতাম, মুনমুন দুর্ধর্ষ সুন্দরী। একদিন হঠাৎ শুনলাম, আমি একটা ছবিতে মুনমুনের বিপরীতে অভিনয় করছি। ছবির নাম ‘অন্তরাল’। সেখান থেকেই আমাদের আলাপ-পরিচয় শুরু।
মুনমুনকে প্রথম দেখলাম এই ‘অন্তরাল’ ছবি শুরুর আগের একটা পার্টিতে। কী বলি! যাকে বলা যায়, ‘প্যারাগন অফ বিউটি’। এমন সুন্দরী এর আগে দেখিনি। মুনমুনের সৌন্দর্যের মধ্যে সব থেকে নজরকাড়া ওর চুল। একটা অসাধারণ ‘কার্ল’ করত চুলে, সেটা একেবারে আন্তর্জাতিক মানের ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’। ঠিক লেডি ডায়ানা যেমন ‘ফ্যাশন আইকন’ ছিলেন, মুনমুনও তেমনই ছিল।
মুনমুনকে নিয়ে বলতে গেলে একটা কথা বলতেই হয় যে, মানুষটা খুব মজার। ‘অন্তরাল’ ছবিতে ‘আজ এই দিনটাকে’ গানটির শুটিং করতে আমরা মুম্বইয়ের চান্দেভেলিতে গিয়েছিলাম। ছবির পরিচালক, প্রযো়জক ও চিত্রগ্রাহক এক জনই ছিলেন। সেখানে পরিচালক উপর থেকে একটা শট নেবেন। আমি মুনমুনকে বুকে জড়িয়ে ধরে শট দিতে যাচ্ছি, দেখি ও মুখটা আমার হাতের ফাঁক দিয়ে বার করছে। খানিকটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করি, “এরকম করছ কেন?” তখন মুনমুন বলে ওঠে, “আমার মুখ ঢেকে যাচ্ছে আর আমার মুখ বিক্রি হয়।” তাই আমার হাতে ওর মুখ ঢেকে যাবে সেটা মুনমুনের পছন্দ হয়নি। এই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও হয়ে যায়।
আসলে আমাদের সম্পর্কটা ‘লভ-হেট রিলেশনশিপ’! ও-ই এই নামটা দিয়েছিল। আমাদের একটা ভালবাসার সম্পর্ক যেমন ছিল, তেমন প্রচুর ঝগড়াও হত। আরও একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার মুনমুন আমার পায়ে কামড়ে দিয়েছিল! ‘অমর কণ্টক’ ছবির শুটিংয়ের সময়ের ঘটনা। দৃশ্যটা ছিল এমন যে, আমাকে সাপে কামড় দিয়েছে। আমি অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছি আর সেই সময় ও মুখে করে আমার শরীর থেকে বিষাক্ত রক্তটা বার করবে। তার পরে আমি বেঁচে যাব। শটের সময়ে রূপটানশিল্পীর একটি তরল পদার্থ দেওয়ার কথা যা দৃশ্যে রক্ত বোঝাবে। সেটাই মুনমুনের মুখে থাকার কথা। কিন্তু, জানি না কী হয়েছিল! মুনমুন মুখে ওই লাল তরলটা নিতে ভুলে গিয়েছিল, না কি গিলে ফেলেছিল! শট কাটতে না পেরে ও আমাকে কামড়াতে শুরু করে। যতক্ষণ ক্যামেরা চলেছে, ও-ও কামড়ে চলেছে। মুনমুন এমনই অদ্ভুত মজার মানুষ। শটের শেষে সে নিজে এসেই আবার বরফ দিয়েছিল। সে দিন মুনমুনের স্বামী এসেছিলেন সেটে। খুব রসিক মানুষ। শটে এমন কাণ্ড ঘটেছে শুনে বলেন, ‘‘তুমি কিন্তু ‘টেটভ্যাক’ নিয়ে নিয়ো। শি ইজ় পয়জ়নাস!’’ এমন কত কত মজা করেছি আমরা।
মুনমুনের সৌন্দর্য দেখার মতো। আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখতাম। ‘অমর কণ্টক’ ছবির শুটিংয়ে আরও একটা ঘটনা ঘটেছিল। ওই ছবিতে সোমা মুখোপাধ্যায়ও অভিনয় করেছিল। এক দিন সে মেকআপের ঘরে পোশাক বদলাচ্ছিল সোমা। মুনমুন আর আমি বাইরে বসে ছিলাম। হঠাৎ মুনমুন গিয়ে ওর ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। সোমা বুঝতে পারে যে, মুনমুনই দুষ্টুমি করেছে। ও ভিতর থেকে রসিকতা করে আবদার করতে থাকে, “ছেড়ে দাও না মুনমুনদি। একজন উঠতি অভিনেত্রীকে এ ভাবে আটকে রাখবে?” সেই শুনে মুনমুন এমন হাসতে শুরু করল, একেবারে বাঁধনছাড়া হাসি। যখন কেউ ও ভাবে হাসে, সাধারণত তাদের মুখ বিকৃত হয়ে যায়। কারণ, মুখের পেশিগুলো ফুলে অদ্ভুত দেখতে লাগে। কিন্তু, একমাত্র মুনমুনকেই দেখেছিলাম, ওই হাসিতেও সে ‘স্বর্গীয় সুন্দরী’। ওর সেই হাসিটা কখনও ভুলব না।
আরও পড়ুন:
মুনমুনের প্রিয় বন্ধু ছিল ওর স্বামী ভরত দেব শর্মা। কিছু দিন আগে ভরত আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আগে মুনমুন নিজের খুব যত্ন নিত। কিন্তু, এখনকার মুনমুনকে যেন চিনতে পারি না। নিজের আর খেয়াল রাখে না। দেখলে মনে হয়, এই মুনমুনকে চিনি না। বয়স হলে, সবারই হয়তো এমনটাই হয়। কিন্তু আমার মনে হয়, একজন সুন্দরীর সৌন্দর্যটা ধরে রাখাই উচিত। সেটা ওর মা বুঝেছিলেন বলেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। কিন্তু মুনমুন সে সবের তোয়াক্কা করে না। তা ছাড়া, ওর মায়ের মতো অত ধৈর্যও ওর নেই। আসল মুনমুন অত্যন্ত সরল একটা মেয়ে।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের হয়তো রাজনীতির আঙিনায় দেখা হয়েছে। তা কিন্তু নয়। ও তো সাংসদ হয়েছিল, আর আমি বিধায়ক হই। আমরা দু’জনের কেউই রাজনীতির লোক নই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে মুনমুন রাজনীতিতে আসে। ওর কাছে সবটাই আসলে একটা ‘অ্যাডভেঞ্চার’। ভীষণ মিষ্টি মানুষ মুনমুন। চাইব, এমনই যেন থাকে, ওর হাসিটা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। ওর হাসিটা বড্ড সুন্দর।