কখনও ব্যস্ত ডাক্তারিতে, কখনও মগ্ন সুরে, প্যাশনের দু’দিকেই ভারসাম্য রাখেন পলাশ সেন
দিল্লিতে পলাশের বাড়িতে সহাবস্থান স্টুডিয়ো এবং ক্লিনিকের। কখনও তিনি ব্যস্ত রোগীকে পরীক্ষা করায়। আবার কখনও তিনি-ই স্টুডিয়োতে মগ্ন নতুন সুরের খোঁজে। প্যাশনের দু’দিকেই ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেন পলাশ।
যিনি জটিল অস্ত্রোপচার করেন, তিনি আবার গানও বাঁধেন। ঝড় তোলেন অসংখ্য মনে। তিনি পলাশ সেন। সুদর্শন এই গায়ক ছিলেন নয়ের দশকের হার্টথ্রব। ইন্ডিপপ শাখায় জনপ্রিয়তার নিরিখে তাঁর ব্যান্ড ‘ইউফোরিয়া’ ছিল প্রথম সারিতে।
সবথেকে বিস্ময়কর হল, গত দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে ইউফোরিয়া। ইন্ডিপপ-এর অন্য শিল্পীরা হারিয়ে গিয়েছেন বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু এখনও জলসায় বাজিমাত করে ইউফোরিয়া।
গানের পাশাপাশি ব্যান্ডের জনপ্রিয়তার মূল কারণ অবশ্যই পলাশের ব্যক্তিত্ব। তাঁকে আমরা পলাশ নামে চিনলেও, স্কুলজীবন অবধি তাঁর নাম ছিল পলি। এক সাক্ষাত্কারে পলাশ জানিয়েছেন, তাঁর বাবার প্রিয় ক্রিকেটার ছিলেন পলি উমরিগড়। তাঁর নামেই ছেলের নামকরণ করেছিলেন। ১৫ বছর বয়সে পলি থেকে পলাশ হন ইউফোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা।
পলাশের জন্ম ১৯৬৫-র ২৩ সেপ্টেম্বর, লখনউ শহরে। তাঁর বাবা, মা দু’জনেই ডাক্তার। বাবা, মায়ের বদলির চাকরি হওয়ায় পলাশের ছোটবেলার বড় অংশ কেটেছে শ্রীনগরে, দাদু-দিদার কাছে। তাঁর মা কাশ্মীরের মেয়ে। পলাশের দাদু ছিলেন শ্রীনগর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। চালকের পাশে বসে জম্মু থেকে শ্রীনগর যাতায়াতের নৈসর্গিক দৃশ্য তাঁর ফেলে আসা শৈশবের প্রিয় স্মৃতি।
পলাশের পৈতৃক পরিবারের পুরনো উপাধি ছিল সেনশর্মা। তার থেকে সেন। তাঁর পরিবারের প্রত্যেক প্রজন্মেই চিকিৎসকদের প্রাধান্য। প্রাচীন রাজবৈদ্য ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষরা। পলাশ পরিবারের সপ্তদশ প্রজন্মের চিকিৎসক।
আরও পড়ুন:
দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়ার সময় থেকেই পলাশ গান ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দিল্লির তেগবাহাদুর হাসপাতাল থেকে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন।
ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই পলাশের ব্যান্ড ‘ইউফোরিয়া’-র সূত্রপাত। তাঁর হস্টেলের ঘরটাই কার্যত ছিল ইউফোরিয়ার আঁতুড়ঘর। পলাশের লেখা প্রথম গান ছিল ‘হেভন অন সেভেন্থ ফ্লোর’। হস্টেলের সাত তলায় নিজের ঘরটাই ছিল গানের বিষয়। তখন পলাশ গান লিখতেন ইংরেজিতে।
কলেজে পলাশের সহপাঠী ছিলেন ডি জে ভাদুড়ি। ব্যান্ডের প্রথম দিন থেকে দু’জনের বন্ধুত্ব অটুট। ভাদুড়িকে ইউফোরিয়া-র ‘মেরুদণ্ড’ বলেন পলাশ। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় ইউফোরিয়ার প্রথম অ্যালবাম ‘ধুম’। আবির্ভাবেই চূড়ান্ত সাফল্য। শ্রোতা এবং সমালোচক, দুই মহলেই জনপ্রিয় হয় অ্যালবামের ‘ধুম পিচাক ধুম’।
এরপর ইউফোরিয়ার বাকি অ্যালবামগুলিও পরপর জনপ্রিয় হয়। ২০০০ সালে ‘ফির ধুম’ এবং ২০০৩ সালে ‘গাল্লি’। লাগাতার সাফল্যে ইউফোরিয়া হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড। ‘ধুম পিচাক ধুম’, লোকগীতির আঙ্গিকে গাওয়া ‘মায়েরি’-র মতো গানের চাহিদা জলসায় এখনও তুঙ্গে।
আরও পড়ুন:
ইউফোরিয়া-র জনপ্রিয় গান ‘কভি আনা তু মেরে গলি’ গানের সঙ্গে পারপরম্যান্স বিদ্যা বালনের কেরিয়ারে প্রথম দিকের কাজের মধ্যে একটি। এই গান নবাগতা বিদ্যাকে পরিচিতি দেয় জাতীয় স্তরে।
ছবিতে পলাশ সেনের প্রথম অভিনয় ২০০২ সালে, ‘ফিলহাল’-এ। মেঘনা গুলজারের পরিচালনায় এ ছবিতে জনপ্রিয় হয় পলাশ সেনের কাজ। এরপর দীর্ঘদিন পরে তিনি ফিরে আসেন অভিনয়ে। ২০১০ সালে ‘মুম্বই কাটিং’ এবং ২০১৫ সালে ‘অ্যায়সা ইয়ে জঁহা’ ছবিতে।
তুলনায় কম হলেও পলাশ সেন প্লে ব্যাক-ও করেছেন। ‘ফিলহাল’, ‘ঢুঁনঢতে রহে যাওগে’, ‘লমহা’-সহ কিছু ছবিতে জনপ্রিয় হয় তাঁর গান। গান করেছেন বাংলা ছবিতেও। ‘বাপি বাড়ি যা’, ‘সন্ধে নামার আগে’ ছবিতে জনপ্রিয় হয় পলাশের গান।
পলাশের স্ত্রী শালিনী কলেজের লেকচারার। তাঁদের ছেলে কিংশুক লস অ্যাঞ্জেলসে ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্র। মেয়ে, কিয়ানা পড়ে দিল্লির ‘দ্য মাদার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’-এ।
দিল্লিতে পলাশের বাড়িতে সহাবস্থান স্টুডিয়ো এবং ক্লিনিকের। কখনও তিনি ব্যস্ত রোগীকে পরীক্ষা করায়। আবার কখনও তিনি-ই স্টুডিয়োতে মগ্ন নতুন সুরের খোঁজে। প্যাশনের দু’দিকেই ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেন পলাশ।
এক সাক্ষাৎকারে পলাশ বলেছেন, প্লেব্যাকের মূল স্রোত গ্রাস করেছে ইন্ডিপপের শাখাকে। হয়, সেই স্রোতে গা ভাসাতে হয়েছে, নয়তো হারিয়ে যেতে হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি থেকে। জানিয়েছেন, নিজের ব্যান্ডের অস্তিত্ব বজায় রাখতেই তিনি প্লেব্যাক থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। ( ছবি: সোশ্যাল মিডিয়া)