Advertisement
E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_02-05-26

Binisutoy: ঝড় তোলে আবেগের প্রতিটি সুতোর বাঁধনে

শ্রাবণী ও কাজলের দু’টি ভিন্ন গল্পে উঁকি দেয় ট্রেন, এক ফালি রুমাল রয়ে যায় গল্পের অন্তর্নিহিত গল্পের রূপক হয়ে।

মধুমন্তী পৈত চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০২১ ০৭:১২

নিস্তরঙ্গ জীবন, মায়ার সংসার আর বিচিত্র মন! তিনটি বিষয়কে এক সুতোয় জুড়ে দিলে তৈরি হয় ‘গল্প’। সে গল্পে চরিত্রদের হাতে ধরা পুতুল নাচের দড়ি। চরিত্ররা পুতুল, আবার পুতুল-নাচিয়েও। শহুরে জীবনের একাকিত্ব, কর্পোরেট দুনিয়ার ক্ষমতাচক্র এবং একরাশ অস্ফুট আবেগ—অতনু ঘোষের ‘বিনিসুতোয়’ ছবির বহিরঙ্গের জগৎ এটাই। কিন্তু এর সমান্তরালে চলেছে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির ভাঙাগড়ার খেলা। দুটো জগতের পাশাপাশি চলনে ছবির কোনও সুতোর বাঁধন আলগা হয়নি। ছবিশেষে দর্শকের মনজুড়ে থাকবে খানিক বিস্ময়, আঁজলাভর্তি ভাল লাগা, মনখারাপিয়া সুরও।

কাজল সরকার (ঋত্বিক চক্রবর্তী) এবং শ্রাবণী বড়ুয়া (জয়া আহসান) ছবির দুই প্রধান চরিত্র। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বদলে যায় তাদের পরিচিতি, জীবনযাপন। থেকে যায় শুধু নামটুকু। কিন্তু কেন? ছবিজুড়ে সে উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা। তবে উত্তর শুধু পরিচালক একা খোঁজেননি। খুঁজেছেন দর্শক, নিজের নিজের মতো করে। গল্প বলার ক্ষেত্রে পরিচালক যথাসম্ভব নৈর্ব্যক্তিক। ছবির নাম অনুযায়ী সুতোগুলো আলগা ভাবে ছড়ানো রয়েছে। কোন সুতো জড়িয়ে কে কোন গল্প বুনে নেবেন, রয়েছে তার অবকাশ। ছবির উত্তরণের ক্ষেত্রে সেটি বড় গুণ।

ছবিতে বারবার উচ্চারিত একটি শব্দ ‘গল্প’। শুরুতেই দেখানো হয় রাশিয়ান ছোটগল্পকার ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির একটি উক্তি। সেখানে ‘স্টোরি’ শব্দটি না থাকলেও, জীবনে গল্পের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে হয়তো সেই উক্তির উত্থাপন। গল্প আছে বলেই সৃষ্টির ধারা অব্যাহত। সে সাহিত্যে হোক বা সিনেমার পর্দায়। ছবিতে কাজল তার ছেলে কাহনকে (স্যমন্তক দ্যুতি মৈত্র) বলে, ‘‘জীবনে গল্প না থাকলেও, তৈরি করে নিতে হয়।’’ এ ছবির গল্পকার অতনু নিজেই। অন্য দৃষ্টি দিয়ে দেখলে, এ ছবির গল্পকার কাজল আর শ্রাবণী। তাদের গল্প দেখতে দেখতে, দর্শকও যেন আরও কিছু গল্প বুনে ফেলেছেন। ফরাসি প্রাবন্ধিক রলাঁ বার্তের ‘দ্য ডেথ অব দি অথর’-তত্ত্বের নিপুণ প্রয়োগ এই ছবি। যেহেতু মাধ্যমটি সেলুলয়েড, সেহেতু তাত্ত্বিক প্রয়োগে ছবিটি শুধু আটকে থাকেনি। বরং ছবির নিয়ম মেনে গল্পটি তার গন্তব্যে পৌঁছয়।

কাজলের চরিত্রে ঋত্বিক নিপুণ। তাঁর মুখে দারুণ মজার এবং পরিস্থিতিভিত্তিক কয়েকটি সংলাপ শোনা যায়। শ্রাবণীর ভূমিকায় জয়া অননুকরণীয়। ভারী সুন্দর লেগেছে তাঁদের জুটিকে। এ ছাড়া পার্শ্বচরিত্রে চান্দ্রেয়ী ঘোষ (কাজলের স্ত্রী জিনিয়া), কৌশিক সেন (শ্রাবণীর সম্পর্কে দাদা), খেয়া চট্টোপাধ্যায় (শ্রাবণীর সহকর্মী), স্যমন্তক দ্যুতি মৈত্র সকলেই তাঁদের চরিত্রে সুন্দর মানিয়ে গিয়েছেন।

অভিনেতারা যে কথাটুকু বলেননি, তা ক্যামেরার ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী চিত্রগ্রাহক আপ্পু প্রভাকর। ছবির প্রথম দৃশ্যের বিশালকায় গাছ থেকে রোদে নিকানো বারান্দায় একটি কমলালেবু, বৃষ্টির শোভা দেখতে মগ্ন শ্রাবণী থেকে দোকানের আরশিতে ধরা শ্রাবণী... ক্যামেরা এ ছবির একটি চরিত্র। দেবজ্যোতি মিশ্রের সঙ্গীতও সুন্দর। শূন্যতা, একাকিত্বের শব্দ শুধু অন্তরে অনুভূত হয়। তা বোঝানোর জন্য জোর করে আবহসঙ্গীত দিয়ে ছবিকে ভারাক্রান্ত করা হয়নি। রূপঙ্কর, ইমন চক্রবর্তীর উদাত্ত কণ্ঠের পাশাপাশি ছবির বাড়তি পাওনা, জয়ার সুললিত কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি...’

ছোট ছোট ডিটেলিং ভারী চমকপ্রদ ছবিতে। যেমন, শ্রাবণী ও কাজলের দু’টি ভিন্ন গল্পে উঁকি দেয় ট্রেন, এক ফালি রুমাল রয়ে যায় গল্পের অন্তর্নিহিত গল্পের রূপক হয়ে। আসলে সকলেই আমরা গল্প বুনি। কোনটা কার সঙ্গে মিলবে, তা কি নিতান্ত কাকতালীয়?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy