তিনি এলে তবে ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করে। তার আগে নাকি থমকে থাকাই দস্তুর!
টলিপাড়ার অন্দরে এমনই গুঞ্জন শোনা যায়। তবে তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা নৈব নৈব চ। কারণ, তিনি এলেই নাকি পরিবেশটা বদলে যায়। সেই তিনি কি সে সব জানেন না? জানেন হয়তো। কিন্তু ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এত বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পরে আর সে সব কথায় বোধ হয় মন দেন না। বরং তিনি সচেতন কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমি অভিনেত্রী। আমার কাছে চরিত্রই আসল। সব সময় যে সুন্দর দেখাতে হবে, সে সব নিয়ে আমি ভাবি না!’’
চরিত্র যদি বলে, সুন্দর হওয়া প্রয়োজন, তবে সুন্দর হবেন তিনি। যদি অন্য কিছু দাবি করে চরিত্র, তবে তিনি তেমনই দেখাবেন নিজেকে। ফলে সাংবাদিকের মুখোমুখি বসে যখন তিনি সাক্ষাৎকার দেন, তখন অন্য প্রান্তে তাঁকে নিয়ে কী আলোচনা হচ্ছে, সে সবে কান দেন না। মন দেন নিজের চরিত্রে। নিন্দকেরা অবশ্য বলেন, এত কথার জন্ম হয় আত্মবিশ্বাস থেকে। কারণ, ঋতুপর্ণা জানেন, তিনি উপস্থিত থাকলে তাঁকেই দেখবে চারপাশ।
ছবি: সংগৃহীত।
এখন ঋতুপর্ণা ব্যস্ত অরিন্দম শীলের ‘কর্পূর’-এর মৌসুমী সেন হয়ে থাকতে। দৃঢ়চেতা এক নারী এখানে তিনি। কলেজের অধ্যাপিকা। ছবিতে তাঁর সাজও তেমন। হালকা, মার্জিত। টানটান করে বাঁধা চুল। সামান্য মেকআপ।
নতুন ছবি সম্পর্কে পরিচালক অরিন্দম জানিয়েছেন, এ ছবি তাঁর ভাবনার জগতের এক নতুন অধ্যায়ের কথা বলবে। থ্রিলার তিনি আগেও বানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক থ্রিলার অন্য রকম। অরিন্দম বলেন, ‘‘আমি এই ছবি করব যখন ঠিক করি, তখন থেকেই ঋতুপর্ণার সঙ্গে কথা বলি।’’ আর তার পরেই ধীরে ধীরে ঠিক হয় কেন্দ্রীয় চরিত্রের ‘লুক’। ঋতুপর্ণা যোগ করেন, ‘‘আমরা প্রথমেই রিসার্চ করেছিলাম, ওই সময়কার চেহারা কেমন হবে। বলি না, এইটা এই সময়ের চেহারা, ওইটা ওই সময়ের চেহারা— তেমন আর কি! আমার খুব ভাল লাগে যে, আমাকে সব ছবিতেই এক রকম দেখতে লাগে না। তাতে যদি আমাকে কখনও দেখতে খারাপও লাগে, আমার কোনও আপত্তি নেই।’’ নিজেই মনে করান, সেই একই তিনি ‘রাজকাহিনী’-তে এক রকম দেখতে, আর ‘আলো’-তে একেবারে অন্য রকম।
আর শুধু দেখতে কেমন লাগছে, তা ভাবলে চলে নাকি, এত বছর ধরে টলিপাড়ায় নিজের জায়গা ধরে রাখা নায়িকার! তার মধ্যে বিয়ে করেছেন। দুই সন্তানের মা হয়েছেন। সিঙ্গাপুরের সংসার সামলেছেন। নিজেই মনে করান সে সব কথা। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘আমি নিজেই কাজ করতে চেয়েছি, লাইমলাইটেও থাকতে চেয়েছি, সংসার করতে চেয়েছি, সন্তান চেয়েছি। সব কিছুতেই দায়িত্ব নিতে লাগে। সে তো আমাকেই নিতে হবে। কী ভাবে এত কিছু সামলাচ্ছি, তা তো অন্য কেউ দেখতে আসবে না!’’ ঋতুপর্ণা বিশ্বাস করেন, জীবনে একটা সময় থাকে, যে সময়টা সব কিছু উপভোগ করার। কাজ থেকে প্রেম, বিয়ে, সংসার, গ্ল্যামার— সব। আর জীবনের একই অধ্যায়ে যদি সব পেতে হয়, তবে তার জন্য পরিশ্রমও করতে হয়।
কাজের কথা অনেকই হয়, সব সময়ে সংসারের কথা হয় না। ছবির প্রচার, মুক্তির কাজের ব্যস্ততার মাঝেও সংসারের কথায় নিজেই ফিরে ফিরে যান নায়িকা। জানান, শত কাজের মাঝেও নিজের স্বামীর জন্য আলাদা সময় রেখেছেন বরাবর। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নিজেদের রোম্যান্সটা ধরে রাখতে চাই। তার জন্য নিজেদের জন্য আলাদা সময় বার করি। একসঙ্গে বাইরে যাই। সবটাই করি এখনও। কারণ, সান্নিধ্য-সঙ্গ আমার কাছে খুব জরুরি।’’
ছবি: সংগৃহীত।
পারিবারিক ঋতুপর্ণা আসলে তো শুধু ঘরোয়া নন, বাইরেটাও সামলাতে হয় অনেক। ইন্ডাস্ট্রির ভালমন্দ সব কিছুতেই জড়িয়ে আছেন তিনি। তা হলে টলিপাড়ায় যখন নানা বিষয় নিয়ে এত হুলস্থূল, তখন তাঁকে কেন দেখা যায় না সে সবের মধ্যে? সে প্রশ্নও তো ওঠে বার বার! অভিনেত্রী জানান, কখনও কখনও স্ক্রিনিং কমিটির বৈঠকে গিয়েছেন তিনিও। ‘‘তবে আমার কাছে অনেক কিছু গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডাস্ট্রির বৃহত্তর স্বার্থটা অনেক বেশি জরুরি। আলাদা আলাদা ঘটনা সব সময়ে আমার কাছে ততটাও গুরুত্ব পায় না হয়তো সে ভাবে। যদিও প্রয়োজনে অনেক সময়ে কিছু কিছু কথা বলেছি,’’ বলেন ঋতুপর্ণা। সিনেমা যে তাঁর কাছে সবার উপরে, বুঝিয়ে দেন ‘কর্পূর’-এর মুখ্য চরিত্র। বলেন, ‘‘সিনেমা কোনও কিছুর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। সিনেমার কিছু স্বাধীনতা থাকা উচিত। আমার হাত ধরে প্রচুর মানুষ এসেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালক আছেন, প্রযোজক আছেন। সেখানে কমিটি যদি কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ও, আমি মনে করি, সবই আলোচনা সাপেক্ষ।’’ অভিনেত্রী বিশ্বাস করেন, আলোচনার ঊর্ধ্বে কোনও কিছুই নয়। যেমন তাঁর মতে, সিনেমা কোনও কিছুর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। তিনি বলেন, ‘‘চারটে হাউস হয়তো মারামারি করছে কোনও সময়ে ছবি মুক্তির জন্য। কিন্তু সেই কয়েকটা হাউসের বাইরেও তো আরও অনেকে আছেন। তাঁরাও তো কাজ করছেন। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি যদি ছোট হতে থাকে, যদি কুক্ষিগত হতে থাকে, তবে তো কোনও প্রসার হবে না। তা হলে আমরা বড় হব কী ভাবে? আমি মানুষ হিসাবেও প্রসারের পক্ষে, অভিনেত্রী হিসাবেও তা-ই। আমি দুনিয়াটা উদার ভাবে দেখতে চাই।’’
ছবি: সংগৃহীত।
তাই তো এক এক সময়ে এক এক ধরনের ছবিতে দেখা যায় তাঁকে, ব্যাখ্যা ঋতুপর্ণার। যত দিন যাবে, তত নতুন ধরনের ছবিতে কাজ করতে চাইবেন। এ বার যেমন করলেন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক একটি ছবি। কিন্তু পর্দার বাইরের রাজনীতিতে দেখা যায় না তাঁকে। কখনও নিজে রাজনীতি করতে ইচ্ছুক হননি? কেউ বলেনি তাঁকে রাজনীতিতে যোগ দিতে? অভিনেত্রীর সহজ উত্তর, ‘‘নিজের জীবনের রাজনীতিই ভাল ভাবে বুঝতে পারলাম না, দেশের রাজনীতি কী বুঝব!’’
আরও পড়ুন:
তিনি নিজেকে সমাজসচেতন মানুষ হিসাবেই দেখেন। নিজেও সমাজের উন্নতির জন্য অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে নিজেকে কোথাও কোনও ধরনের রাজনীতির মধ্যে আটকে ফেলতে চান না। বলেন, ‘‘রাজনীতির জন্য আমি ঠিক তৈরি নই!’’