হাঁটাচলা করার সময়ে হাঁটুতে তেমন ব্যথা হয় না। অথচ সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই হাঁটুতে যন্ত্রণা হয়। কেন এমন হয়, তা মনে হয়েছে কখনও? শুধু বাত থাকলে বা মালইচাকির কোনও সমস্যা থাকলেই যে তা হবে, তেমন নয়। অনেক সুস্থ মানুষও যতটা দ্রুত হাঁটতে পারেন, ততটা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে পারেন না মোটেও। কারণ, সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই হাঁটু বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হয় মটমট শব্দ, না হলে ভীষণ যন্ত্রণা। খেয়াল করে দেখবেন, যিনি বাতের রোগী, তিনি দিব্যি কয়েক কদম ঠিকমতো হাঁটতে পারলেও, সিঁড়ি ভাঙতে পারেন না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলেই যেন চাবুকের মতো ব্যথা কষায় হাঁটুতে। এতএব, যত গোলমাল সেই হাঁটুরই। যত ব্যথাবেদনা সবই সেই সিঁড়ি ভাঙার সময়েই কেন হয়, তার কারণ জটিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যাখ্যা আছে।
সিঁড়ি ভাঙতে গেলে হাঁটুতে ব্যথা হয় কেন?
দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটা-চলা, শোয়া-বসা, সবের জন্যই হাঁটুর উপরেই নির্ভর করতে হয়। হাঁটুর জয়েন্ট অনেকটা দরজার কবজার মতো। দরজার কবজার তো একটি লক থাকে, কিন্তু হাঁটুর কবজার তিনটে লক— ফিমার (কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত পায়ের হাড়), টিবিয়া (হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পায়ের হাড়) এবং এই দুইয়ের মাঝে থাকে কার্টিলেজ ও মালাইচাকি। পাতলা ফাইবার দিয়ে তৈরি কার্টিলেজ স্নায়ুহীন। হাঁটুর হাড়ে এটি অনেকটা কুশন বা নরম বালিশের মতো কাজ করে। অর্থাৎ, ঘর্ষণ প্রতিরোধ করে। কার্টিলেজ নষ্ট হয়ে গেলে ফিমার ও টিবিয়ার মধ্যে সরাসরি ঘষা লাগে। শুরু হয় যন্ত্রণা। সিঁড়ি ভাঙতে গেলে এই ঘর্ষণ বেশি হয়, ফলে ব্যথা হয়।
হাঁটুর জয়েন্টে ব্যথা হয় কেন? ছবি: ফ্রিপিক।
এখানে মালাইচাকিরও বড় ভূমিকা আছে। জন্স হপকিন্স মেডিসিনের গবেষকেরা জানাচ্ছেন, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময়ে যাঁদের হাঁটুর ব্যথা বেশি হয়, ধরে নিতে হবে তাঁদের মালাইচাকিরও সমস্যা আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে ‘প্যাটেলোফিমোরাল পেন সিনড্রোম’। হাঁটুর সামনের দিকে চাকতির মতো গোলাকার ছোট হাড়টিকে বলে মালাইচকি বা প্যাটেলা। এটির কাজ হল কোয়াড্রিসেপ পেশিকে ধরে রাখা ও সেই অঞ্চলের লিগামেন্টগুলির ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে চলাফেরা, ওঠাবসা, দাঁড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা, দৌড়োনোর মতো কাজগুলি সঠিক ভাবে করা যায়। মালাইচাকি যদি বিকল হতে থাকে বা তার কার্যক্ষমতা কমতে থাকে, তখন এই কাজগুলি করতে সমস্যা হবে। বয়সজনিত, জন্মগত ও দুর্ঘটনার কারণে অথবা কোনও অসুখবিসুখের জন্য মালাইচাকির সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমন হলে অস্থিসন্ধির লিগামেন্টগুলিও ঠিকমতো কাজ করতে পারবে না, এতে হাঁটুর উপর চাপ বেশি পড়বে এবং ঘর্ষণ বেশি হবে। ফলে যন্ত্রণা হবে। সিঁড়ি ভাঙার সময়ে এমনিতেও হাঁটুতে চাপ বেশি পড়ে, তার উপরে মালাইচাকি দুর্বল হলে সমস্যা আরও বাড়বে।
আরও পড়ুন:
কাদের বেশি হয়?
এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন তিরিশের কোঠার বা তার চেয়েও কমবয়সি মহিলা এবং খেলোয়াড়রা। দীর্ঘ ক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকা, ভারী ওজন তুলতে গিয়ে আঘাত, জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করার সময়ে চোট লাগার কারণে মালাইচাকির কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির আস্তরণ রুক্ষ হয়ে যায়, ফলে ফিমারের তলার অংশে ঘষা লেগে কার্টিলেজের ক্ষতি হয়। কমবয়সিদের ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা বেশি, এ কারণেও সমস্য শুরু হয়।
আর হয় বয়স্কদের। তবে সেটি বয়সজনিত কারণে হাড়ের ক্ষয়ের জন্য হতে পারে। অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস থাকলে হাঁটু ফুলে যায়, পেশির ক্ষয়ের ফলে সমস্যা শুরু হয়।
ফ্ল্যাট ফুট বা সমতল পায়ের পাতা এই সমস্যার আর একটি কারণ।
অতিরিক্ত ওজনও দায়ী হতে পারে। হাঁটু শরীরের ওজন ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না। ফলে অসম চাপে কার্টিলেজের ক্ষয় হয়। ক্রমাগত এই ক্ষয় মেরামত করতে শরীর আর কার্টিলেজ তৈরি করতে পারে না, তার পরিবর্তে হাড় তৈরি করে। যাকে বলে 'অস্টিয়োফাইটিক গ্রোথ'। এই হাড় সহজেই ভেঙে যায় এবং হাঁটুতে যন্ত্রণা হয়। তাই হাঁটু ভাল রাখতে শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।