বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সেই বাড়ি। নম্র অভিজাত ভিক্টোরীয় সজ্জার বৈঠকখানা। দেওয়ালে কালজয়ী পেন্টিং। গাঢ় গালিচার এক পাশে একটি ইজ়েলে সুচিত্রা সেনের সাদা-কালো ছবির পায়ের কাছে কালো ফুলদানিতে একগুচ্ছ সাদা লিলি। বেজ রঙের সোফার উপর পাতা সবুজ মণিপুরি চাদর।
এই রূপকথা যিনি আলতো লীলায় তৈরি করতে পারেন, সেই রূপসী কন্যা আমার সামনে বসে, মিষ্টি হেসে বললেন, “দেখো, আমার মায়ের চুড়ি পরেছি।”
মুনমুন সেন। গরদের শাড়ির জমির মতো হাতের রং। হাত চুলে দিতেই মণিবন্ধে জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠল সুচিত্রা সেনের সোনার চুড়ির গোছা।
মায়ের একগোছা সোনার চুড়ি কন্যা মুনমুন সেনের হাতে। ছবি: সংগৃহীত।
কথা হচ্ছিল বাংলার সাবেক তাঁতের শাড়ি নিয়ে। মুনদি বলে উঠলেন, “জানো, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবির জন্য মা নিজে গিয়ে শাড়ি কিনেছিলেন। আমি সঙ্গে থাকতাম। কখনও আবার পরিচালক দীনেন গুপ্তও থাকতেন। প্রফুল্ল থেকে দেবী চৌধুরাণী হয়ে ওঠার পথে শাড়ি আর সাজের যে বদল, তা নিয়ে মায়ের নিজেরও অনেকটা ভাবনা ছিল। আমার কাছেও খুব স্পষ্ট ছিল, মা ঠিক কী চাইছেন। ‘দেবী চৌধুরাণী’র ব্লাউজ়ের ডিজ়াইনও আমার করা।”
কথাটা মাথায় বিঁধল আমার। যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের কৃতী ছাত্রী মুনমুন সেন নিজেকে আড়ালে রেখেছেন বরাবর। “জানো, আমি সারা ঘরে চালগুঁড়োর আলপনা দিয়ে রাখতাম। মা শুটিং সেরে বাড়ি ফিরে সেই আলপনা দেখে কী যে খুশি হতেন!” বলে ওঠেন সেই আড়ালে থাকা মুনদি।
আমি যেন নিজের চোখে দেখতে পেলাম, বালিগঞ্জের সেই দালানবাড়ির মেঝে ছুঁয়ে আলপনা শেষ করেছে কিশোরী মেয়ের চালধোয়া হাত। কাজের শেষে সেই আলপনায় পা রেখে বাংলা চলচ্চিত্রের সুচিত্রা সেন হয়ে উঠছেন এক কন্যার মা— রমা। রমা তো লক্ষ্মীর আর এক নাম!
‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিতে সুচিত্রা সেন। ছবি: সংগৃহীত।
এক দিকে রুপোলি জগৎ, অন্য দিকে সংসার। সুচিত্রা সেনের জন্মদিনে মাথায় উঠে এল একটি প্রশ্ন। কী ভাবে দুই জগতের মধ্যে সমতা রাখতেন তিনি? মুনদি বলেন, “সে বড় জটিল বিষয়। আর এক দিন হবে সে কথা।” তার পরেই তিনি বলে ওঠেন, “‘ফরিয়াদ’ ছবিতে মা গাউন পরেছিলেন। সেটাও আমি ডিজ়াইন করেছিলাম।”
অতীত হাতড়ে মুনদি বলতে থাকেন, “খুব ছোট আমি তখন। বাইরের স্কুলে পড়ি। যখন বাড়ি আসতাম, আমার নানা কাজে উৎসাহ দিতেন মা। সেটা পিয়ানো বাজানো হোক, আলপনা দেওয়া, বা ছবি আঁকা। আমি তখন খুব ছোট। একটি ছবিতে মা বিয়ের কনের চরিত্রে। মা চাইলেন, তাঁর কপালের চন্দন আমি পরিয়ে দিই। মায়ের কোলের উপর বসে সেই চন্দন আমিই পরিয়ে দিয়েছিলাম।”
শুনে মনে হল, যেন মা-মেয়ে নয়। দুই সখী! মুনদির বিয়েতে তাঁর মা তাঁকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছেন। সেই ছবি আমরা কাগজে দেখেছি। আর কনের সাজে মায়ের কপালে কন্যার চন্দন পরানোর গল্প শুনে আমার মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের গান— “সখীরে সাজাব সখার প্রেমে”।