Advertisement
E-Paper

তৃণমূলের পরাজয়ে আনন্দিত তো বটেই, এ বার বিজেপির সঙ্গে সরাসরি মতাদর্শের লড়াই

তৃণমূল পরাজিত হওয়ার আনন্দ না কি বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে হতাশা? কাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বামেরা? নিজের মতামত জানালেন বাম সমর্থক অভিনেতা-পরিচালক সৌরভ পালোধী।

সৌরভ পালোধী

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৮:৫৮

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল আমি দেখে আমি খুবই ইতিবাচক। একটি আসনকে আমি ‘মাত্র একটি’ হিসাবে দেখছি না। ২০১১-য় বাম সরকার পড়ে যায়। খুবই দুঃখের ছিল। ২০১৬-য় কিছুটা ফেরার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ২০২১-এ শূন্য হয়ে যাওয়া আরও দুঃখের। ২০২৬-এ এসে একটি আসন ফিরে পাওয়া আনন্দের।

২০১১-য় সিপিএমকে সরাতে মানুষ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল। তার মধ্যে আমি কোনও ভুল দেখি না। তবে আমাদের আশঙ্কা যা ছিল, তা-ই ফলল। বিজেপিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই পশ্চিমবঙ্গে জায়গা করে দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় তো আমরা বিজেপিকে ভাবতাম দিল্লির রাজনৈতিক দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে খাল কেটেছিলেন, সেখানে কুমির তো ঢুকে পড়বেই। এ তো হওয়ারই ছিল।

বিজেপি ও তৃণমূল দুই দলেরই মতাদর্শের বিরোধিতা করি। যে দল ধর্মীয় বিভাজন, জাতপাত নিয়ে ভেদাভেদ করে এবং মহিলাদের অন্য চোখে দেখে, তাদের বিরোধিতা তো অবশ্যই করি। যে দলের স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’, তাদের কী বলব? আমার রাম নিয়ে আপত্তি নেই। পুজো, ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, এগুলো তো ব্যক্তিগত বিষয়। রামনবমী হওয়া নিয়েও কোনও আপত্তি নেই। বাড়িতে আমার মা-ও পুজো করেন। বাঙালি বাড়িতে যে পুজো হয়ে আসছে বছরের পর বছর, সবটাই করেন। আমি পুজো করি না, সেটা তো আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ‘জয় শ্রীরাম’, ‘জয় মা কালী’ বা ‘আল্লা হু আকবর’ বলে তো কোনও রাজনৈতিক স্লোগান হতে পারে না। যে ভাবে ‘জয় শ্রীরাম’ বলা হচ্ছে, তা-ও যেন ধ্বংসাত্মক।

পশ্চিমবঙ্গে একই সঙ্গে মানুষ নিজের ধর্মীয় আচার পালন করতেন। কেউ পুজো করতেন, কেউ করতেন না। কেউ ইদ পালন করতেন, কেউ বড়দিন পালন করতেন— এই সহাবস্থান এক কালে পশ্চিমবঙ্গে ছিল। ফের এটা সম্ভব একমাত্র বামেদের হাত ধরেই। আর কোনও গতি নেই। আর এই গতির জন্য তৃণমূলের যাওয়া প্রয়োজন ছিল।

অনেকেই নানা জায়গায় বলছেন, বামেদের সমর্থনেই বিজেপি আসতে পেরেছে। কিন্তু এই ‘সমর্থন’ শব্দটা ভুল। হয়তো এমন সাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা ২০২১-এ সিপিএম-কে ভোট দিয়েছেন এবং হতাশ হয়েছেন। এ বার হয়তো তাঁরা বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন তৃণমূলকে সরানোর জন্য। সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দেবেন, সেই বিষয়ে মানুষকে বোঝানোর সাংগঠনিক দায়িত্ব রয়েছে পার্টির। কিন্তু কারও বিজেপি-কে বা যে কোনও দলকে ভোট দেওয়ার অধিকার তো আছেই।

২০৩১ সালে যদি বাম ক্ষমতায় আসে, ভোট তো এই সাধারণ মানুষই দেবেন। সাধারণ মানুষের ভোট পরিবর্তন হয়েই থাকে। কিন্তু দলের প্রতিনিধিরা বদলে গেলে, তা অবশ্যই সমস্যার। যেমন ইতিমধ্যেই টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির লোকজন বেসুরো হতে শুরু করেছেন। যাঁরা একসময় স্বরূপ বিশ্বাস ও অরূপ বিশ্বাসকে সমঝে চলত, তাঁরাই আজ তাঁদের দিকে প্রশ্ন তুলছেন। হঠাৎই মানুষের বিজেপি-প্রীতি বেড়ে গিয়েছে।

ইন্ডাস্ট্রির কিছু ধান্দাবাজ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত। তাঁরা বাম, তৃণমূল দুই দলের থেকেই সুবিধা নিয়েছেন। এ বার বিজেপির কাছ থেকে সুবিধা নেবেন। কিন্তু কিছু মানুষ ব্যতিক্রমী। আমি বরাবর গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই মমতা-বিরোধী ছিলাম। তাই তাঁর পতন তো আমাকে আনন্দ দেবেই। তিনিই বিজেপিকে বাংলায় জায়গা করে দিয়েছেন। ঠিক আছে। এ বার বিজেপির সঙ্গে সরাসরি মতাদর্শের লড়াই হবে। বিপরীতমুখী দুই মতাদর্শের লড়াই। এর মধ্যে সুবিধার হল— আর তৃণমূলের মুখোশের আড়ালে কোনও বিজেপি থাকবে না। তৃণমূল দলটাই আর থাকবে না।

বাম শূন্য থেকে এক হয়েছে। কিন্তু তাঁরা আজও পার্টি অফিস খুলে বসেছেন। সমস্যা হলেই তাঁরা রুখে দাঁড়াবে। দল এখনও সক্রিয় আছে। তৃণমূলের অনেকেই তো ইতিমধ্যেই গেরুয়া আবির মেখে ঘুরছেন। কেউ কেউ বাঁচার জন্য তা করছেন। পার্টি অফিস থেকে ভুয়ো রেশন কার্ড পাওয়া যাচ্ছে, এমন খবরও পাচ্ছি। সবচেয়ে বড় কথা, গণনা কেন্দ্র থেকে বেরোতেই তৃণমূল নেতাদের ‘চোর’ তকমা শুনতে হচ্ছে। এটাই অসম্মানের। বামেরা যখন চলে যায়, তাঁদের নেতাদের দেখে মানুষ ‘চোর চোর’ বলে চেঁচায়নি। মাথা উঁচু করে নিজের ভুল মেনে ইস্তফা দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

সবশেষে ফের বলব, তৃণমূলের চলে যাওয়া খুবই আনন্দের। বিজেপির সঙ্গে বরাবরের মতাদর্শের লড়াই ছিল, আছে এবং থাকবে। আমি আমার কাজের মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তা দেব। আর বিজেপি যদি সাম্প্রদায়িকতা দেখাতে শুরু করে, এই মানুষই আর ১৫ বছর সময় দেবে না। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, “এই বাংলায় ধর্মীয় বিভাজন করতে এলে মাথা ভেঙে দেব।” তখন এই বাংলার মানুষই করতালি দিয়েছিলেন। তাই আজও পশ্চিমবঙ্গ ও তার মানুষের উপর ভরসা আছে।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

Saurav Palodhi
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy