শনিবারের বিকেল চারটে। টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় পা রাখলেন অভিনেতা ঋষি কৌশিক। তত ক্ষণে এসে গিয়েছেন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত, পরিচালক অরিন্দম শীল, সাংসদ-অভিনেতা জুন মালিয়া, বাদশা মৈত্র, পাপিয়া অধিকারী-সহ আরও অনেকেই।
স্টুডিয়ো চত্বরে রুপোলি পর্দার জনপ্রিয় মুখেদের আনাগোনা থাকেই। শনিবার দিনটি তার থেকে আলাদা। এ দিন সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ‘বিচার’ চেয়ে পথে জড়ো হয়েছিল টলিউড। শোভাযাত্রায় পা মেলাবেন তাঁরা। তার আগে নিচু গলায় রাহুলকে নিয়ে আলাপচারিতা। ২৯ মার্চ থেকে হাজার বার ওঠা প্রশ্নগুলো তাঁদের ঠোঁটেও। কারণ, জবাব মিলছে না!
এ দিন স্টুডিয়োপাড়ায় উপস্থিত আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধিরাও। প্রশ্নমালা সাজিয়ে। কী জবাব মিলল ইন্ডাস্ট্রির ‘হুজ হু’দের থেকে?
সাংবাদিকদের মুখোমুখি ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। নিজস্ব চিত্র।
প্রশ্ন: শোনা যায়, ব্যয়ভার এড়াতেই নাকি ফেডারেশনকে এড়িয়ে ‘গুপি শুট’ করেন প্রযোজক বা পরিচালক। ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর মতো প্রথম সারির প্রযোজনা সংস্থা এই পথে হাঁটল কেন?
স্বরূপ: প্রযোজনা সংস্থার কর্ণধার সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন, এই পদক্ষেপের কী প্রয়োজন ছিল? এটার কোনও প্রয়োজন ছিল না। একটা বড় চ্যানেলের থেকে যখন একটি বড় প্রযোজনা সংস্থা কাজ নেয়, তখন সব কিছু দেখেশুনেই চুক্তি হয়। তার পরেও কেন এই ধরনের কাজ করার প্রয়োজন পড়ল, সেটা তাঁরাই বলতে পারবেন। সত্যিই, এর জবাব আমার কাছে নেই।
প্রশ্ন: প্রথম সারির চ্যানেলে রাহুল অভিনীত ধারাবাহিকটি দেখানো হচ্ছিল। সেই চ্যানেল কর্তৃপক্ষই বা নীরব কেন?
স্বরূপ: এই উত্তরও চ্যানেল কর্তৃপক্ষই দিতে পারবেন। তবে অবশ্যই তাঁদের এগিয়ে এসে কিছু বলা উচিত ছিল।
জবাব হাতড়াচ্ছেন অরিন্দম শীল, পিয়া সেনগুপ্ত, জুন মালিয়া। নিজস্ব চিত্র।
প্রশ্ন: আমন্ত্রণ পায়নি বলে পদযাত্রায় নেই আর্টিস্ট ফোরাম! ইন্ডাস্ট্রির ‘আমরা ওরা’ কাম্য?
পিয়া: আর্টিস্ট ফোরামের কথা সংগঠনের সদস্যরা ভাল বলতে পারবেন। ইম্পার পক্ষ থেকে সমস্ত সদস্য শুরু থেকে বলে এসেছেন, তাঁরা প্রত্যেকে রাহুলের সঙ্গে ছিলেন-আছেন-থাকবেন। তবে আমার মতে, এই ধরনের ঘটনায় রাজনীতির রং না লাগিয়ে, ভেদাভেদ না করে সকলের একজোট হয়ে প্রতিবাদ করা উচিত, যাতে রাহুল, তাঁর সন্তান, তাঁর পরিবার ন্যায় পান। তাঁদের জমে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পান।
কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদী বাদশা মৈত্র। নিজস্ব চিত্র।
প্রশ্ন: রাহুলের দেহ বাম দলের লাল পতাকায় মুড়ে, স্লোগান দিতে দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিস্তর সমালোচনার জবাব কী দেবেন?
বাদশা: আমি বা রাহুল কেউ তো দল করি না। আমরা সমর্থন করি। এবং মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমর্থন করি। তাই আমাদের মৃত্যুর পর সেই বন্ধুরা, যাঁদের মঞ্চে গিয়েছি, তাঁরা যদি আমাদের লাল পতাকা দিয়ে সম্মানিত করতে চায়, সেটা তো সম্মানের, ভালবাসার, আবেগের! রাহুলের তো ‘দু’দিকেই আছি’ এই অবস্থান ছিল না।
প্রশ্ন: নীরবতাও শোকপ্রকাশের মাধ্যম হতে পারত? গান, লাফালাফি বা প্রায় নাচের ভঙ্গিতে স্লোগান দেওয়ার প্রয়োজন ছিল?
বাদশা: শোকপ্রকাশের মাধ্যম কী রকম হবে, সেটা কেউ বলতে পারেন না। অনেক মা সন্তানকে হারিয়ে চুপ হয়ে যান। অনেক মা বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমার মতে, রাহুল যেহেতু তাঁর রাজনৈতিক চেতনা বা বোধ প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, তাই ওঁর ক্ষেত্রে এটা কোনও অন্যায় দেখিনি। যিনি ‘দু’দিকেই আছি’ তালিকায়, তার ক্ষেত্রে ‘দখলদারি’ মনে হতে পারে।
শোকস্তব্ধ পরিচালক-অভিনেতা জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, পরিচালক অভিরূপ ঘোষ, ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী, অনির্বাণ চক্রবর্তী। নিজস্ব ছবি।
প্রশ্ন: আগামী দিনে অভিনেতারাই কি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবেন?
অনির্বাণ: এটা সম্ভব নয়। কারণ, আমরা তো একা কাজ করি না। ইউনিটের সঙ্গে যাই, সেই ইউনিটের সদস্য হয়ে। সেখানে ইউনিট যা নির্দিষ্ট করবে, সেটাই মানতে হবে। আমরা একা কিছুই করতে পারি না।
টালিগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী। নিজস্ব ছবি।
প্রশ্ন: টালিগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী কি রাহুলকে ন্যায় পাইয়ে দিতে পারবেন?
পাপিয়া: তারও আগে আমি অভিনেত্রী। এই ইন্ডাস্ট্রির অংশ। সেই জায়গা থেকে বলব, অভিনেতাদের কুকুর-বেড়ালের মতো দেখা বন্ধ হোক। ন্যূনতম যেটুকু সুরক্ষার প্রয়োজন সেটা দেওয়া হোক। অন্য রাজ্যে কাজের আগে তার জন্য অনুমতি নেওয়া হোক। না হলে রাহুলের মতো অভিনেতারা এ ভাবেই শেষ হয়ে যাবেন।
প্রশ্ন: অভিযোগ জানাতে এক সপ্তাহ লেগে গেল?
পাপিয়া: কারণ ওই প্রযোজনা সংস্থা। কারণ, ফেডারেশন। এরা প্রচণ্ড শক্তিশালী। এদের বিরুদ্ধে যাওয়া সহজ নয়। সেটা আমরা আরজি কর-কাণ্ডেই দেখেছি। সেই সময় যাঁরা পথে নেমেছিলেন, তাঁরা পরে কাজ হারিয়েছেন। এ বারেও যদি সেটা ঘটে তা হলে আর চুপ থাকব না। ফেডারেশন ঘাড় থেকে সব ঝেড়ে ফেলে দায়মুক্ত হতে পারে না।
রাহুলের জন্য পদযাত্রায় টলিউড। নিজস্ব ছবি।
প্রশ্ন: প্রত্যেক প্রযোজনা সংস্থাই কি ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর মতো অসাবধানী?
ঋত্বিক: এ ক্ষেত্রে প্রত্যেককে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তবে এটা ঠিক, আমরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সতর্ক। অভিনেতা, টেকনিশিয়ান উভয়ের ক্ষেত্রেই। এ বার কিন্তু সজাগ হওয়ার সময় এসেছে আমাদের। রাহুলের মৃত্যু দিয়ে আমরা শিখছি, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
প্রশ্ন: আর্টিস্ট ফোরাম কেন এত দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানাল?
ঋত্বিক: ওরা ওদের মতো করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পদক্ষেপও করছে। আমি বিচার করার কেউ নই। বরাবরের মতো আমি এখনও ওই সংগঠনের সঙ্গেই আছি।
রাধা স্টুডিয়োর সামনে অভিনেতা ও কলাকুশলীরা। ফাইল চিত্র।
প্রশ্ন: অনেক দেরিতে কি সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেন?
অরিন্দম: কেন হতে হবে? প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন। কেন একটা প্রাণ, একজন মানুষ এ ভাবে চলে যাবেন? এরকম কিছু ঘটলে আইনি পথে এগোতে হবে। সেগুলো ঠিকমতো না হলে এরকম মিছিল হবে, প্রতিবাদ হবে। শুটের অনুমতি নেই, সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই! আজ যেখানে ভিএফএক্স-এর সহযোগিতায় অনেক কিছু করতে পারি, সেখানে ড্রোন শটের জন্য প্রয়োজনা সংস্থা চারপাশ ফাঁকা করে দিল! প্রযুক্তির সাহায্যেই তো প্রয়োজনীয় দৃশ্য বা অভিনেতাকে মুছে দেওয়া যায়। প্রযোজনা সংস্থার কি ওইটুকু খরচ করার মতো সামর্থ্যও নেই? এই প্রযোজনা সংস্থা চিরকাল এ ভাবেই শিল্পী-কলাকুশলীদের ‘এক্সপ্লয়েট’ করে এসেছে। তাঁদের অবজ্ঞা করেছে। তারই ফল এটা। প্রযোজনা সংস্থার অন্যতম কর্ণধার বলছেন, ‘রাহুলকে ভালবাসি’। ভালবাসলে এ ভাবে রাহুল হারিয়ে যেত না।
প্রশ্ন: রাহুলের মৃত্যু অভিনেতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল?
জুন: আমি আগেও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছি। তাই জন্য অনেক প্রোডাকশন হাউসের কাছে অপ্রিয়ও হয়ে গিয়েছি। মুম্বইয়ের প্রযোজনা সংস্থাগুলি তো এই ভাবে কাজ করে না।