তালসারিতে ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকে অভিনয় করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে গেলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ, ধারাবাহিকের প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ প্রশাসনিক অনুমতি না নিয়ে এবং সঠিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই সমুদ্রে শুটিং করায় এই দুর্ঘটনা।
রাহুলের মৃত্যু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, তা হলে কি ইন্ডাস্ট্রিতে যথেষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা ছা়ড়াই শুটিং হয়? এই প্রশ্ন যথার্থ হলে, অভিনেতা-কলাকুশলীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? আগামী দিনে আবার যে এ রকম ঘটনা ঘটবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে?
অভিনেতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ‘বিচার’ চেয়ে শনিবার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পথে নেমেছিলেন বাংলা বিনোদনদুনিয়ার অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, কলাকুশলীরা। উত্তর খুঁজতে রবিবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় বৈঠক করে আর্টিস্ট ফোরাম, ফেডারেশন। পরে দুই সংগঠন যৌথ ভাবে এক বিবৃতিতে জানায়, মঙ্গলবার লাগাতার কর্মবিরতি টলিউডে। এই সিদ্ধান্তে অভিনেতা, কলাকুশলী, পরিচালক সকলের সায় রয়েছে। ছবি, ধারাবাহিক, সিরিজ়— সব কিছুরই শুটিং আপাতত বন্ধ। শহরের বাইরে যাঁরা শুটিং করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অবশ্য এই নীতি কার্যকর নয়।
কী কারণে টলিউড এককাট্টা হয়ে মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতিতে শামিল হতে চলেছে? রবিবার আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, ফেডারেশনের পক্ষ থেকে স্বরূপ বিশ্বাস, প্রযোজকদের পক্ষ থেকে অরবিন্দ জানান, যে প্রযোজনা সংস্থার হয়ে শুটিং করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন রাহুল, সেই ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর ভয়াবহ অমানবিক রূপ দেখে ভীত ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকে। প্রযোজনা সংস্থার তরফ থেকে কেউ রাহুলের পরিবারের প্রতি কোনও সমবেদনা জানাননি। উপরন্তু এই ঘটনার জেরে দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে যে সমস্ত প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তারও জবাব দেয়নি। পাশাপাশি, দুর্ঘটনার পরের মুহূর্ত থেকেই একের পর এক সাজানো কথা বলতে শোনা গিয়েছে ধারাবাহিকের প্রোডাকশন ম্যানেজার, পরিচালক, কার্যনির্বাহী প্রযোজককে। “চিত্রনাট্যে জলে নেমে শুটিংয়ের কথা ছিল না”, এমন কথা বলেছেন খোদ লীনা গঙ্গোপাধ্যায়। এ সবের প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মবিরতির পথে টলিউড।
পাশাপাশি, ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কড়া, আরও আঁটোসাঁটো করতে নতুন ‘এসওপি’ তৈরি করতে হবে এবং তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে, এমনই দাবি ইন্ডাস্ট্রির সকলের।
কার কাছে এই দাবি? কারণ, সমস্ত আউটডোর শুটিংয়ের দায়িত্বে থাকে প্রযোজনা সংস্থাগুলো। টলিউডে লাগাতার কর্মবিরতির সিদ্ধান্তে সায় রয়েছে তাদেরও। তা হলে? প্রশ্ন করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। এ প্রসঙ্গে আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে শান্তিলাল বলেছেন, “এই দাবি সমস্ত চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এবং ইম্পার কাছে। ইতিমধ্যেই আর্টিস্ট ফোরাম এবং ফেডারেশন তাদের আইনজীবীদের সহযোগিতায় আলাদা করে দুটো ‘এসওপি’ তৈরি করছে। এই পৃথক দুটো ‘এসওপি’ জমা দেওয়া হবে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এবং ইম্পার কাছে।” এ প্রসঙ্গে ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত বলেছেন, “সংগঠন বরাবর ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল চেয়েছে। তার পরেও যে তাতে ফাঁক থেকে গিয়েছে, সেটা প্রমাণ করে দিল রাহুলের মৃত্যু। এ বার সেই ফাঁক ভরানোর সময় এসেছে।”
দু’টি সংগঠন তাদের তৈরি ‘এসওপি’তে কোন কোন বিষয়ের উপরে জোর দিচ্ছে?
ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ এবং আর্টিস্ট ফোরামের সম্পাদক শান্তিলাল সে বিষয়ে এখনই জানাতে নারাজ। উভয়ের বক্তব্য, সঠিক সময়ে সব কিছুই প্রকাশ্যে আসবে। তবে সমস্ত দিক নজরে রেখেই তৈরি হচ্ছে ‘এসওপি’, যাতে আর কেউ রাহুলের মতো অকালে হারিয়ে না যান। মঙ্গলবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় উপস্থিত থাকবেন সমস্ত অভিনেতা, কলাকুশলী। প্রযোজক, ইম্পার প্রতিনিধি এবং চ্যানেল কর্তৃপক্ষদেরও ডাকা হয়েছে। সেখানে আলোচনা করে বিষয়টি নির্ধারিত হবে। উভয়ে এ-ও জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ইম্পার তরফ থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় উপস্থিত থাকার ব্যাপারে সম্মতি জানানো হয়েছে।
এ দিকে টলিউডের অন্দরের খবর, লাগাতার কর্মবিরতি না-ও হতে পারে। মঙ্গলবারের কর্মবিরতি ‘প্রতীকী কর্মবিরতি’। এ রকমই কি কিছু ঘটতে চলেছে? পুরোটাই যদি বৈঠক বা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তা হলে কর্মবিরতির প্রয়োজন কী? একদিকে আলোচনার মাধ্যমে পথ খোঁজা। নতুন ‘এসওপি’ তৈরি করা। অন্য দিকে, রোজের শুটিং। এ ভাবেও তো বিষয়টি হতে পারত। শান্তিলালের কথায়, “তার উপায় ছিল না বলেই কর্মবিরতি। কারণ, রবিবার চ্যানেলের প্রতিনিধিদের ডাকা হলেও কেউ উপস্থিত থাকেননি। আর শুটিং চলতে থাকলে আলোচনার গুরুত্ব হারাবে। কারণ, প্রত্যেকেই মনে করবেন, তাঁদের কাজ তো হচ্ছে!” বিষয়টির গুরুত্ব যাতে না হারায়, তার জন্যই সর্বসম্মতিক্রমে কর্মবিরতির ডাক।
শান্তিলাল, স্বরূপ উভয়েই জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকলের উপস্থিতি জরুরি। সবাই মিলে নতুন ‘এসওপি’তে সম্মতি জানালে তবে তা গৃহীত হবে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ লিখিত ভাবে সেটা মেনে নিলে তবে সেটি কার্যকর হবে। এত পদক্ষেপ যদি মঙ্গলবারের মধ্যে করা যায়, তা হলে কর্মবিরতি উঠে যাবে। যদিও শান্তিলাল আরও যোগ করেছেন, “সমস্ত চ্যানেল কর্তৃপক্ষ যত ক্ষণ না আলোচনায় যোগ দিয়ে লিখিত ভাবে নতুন ‘এসওপি’ মেনে চলায় সম্মতি জানাচ্ছে, তত ক্ষণ কর্মবিরতি উঠবে না। একবার কর্মবিরতি উঠে গেলে নিরাপত্তার দিকটি আবার অবহেলিত হবে।”