সকাল থেকেই কাজ করতে করতে ঝিমিয়ে পড়ছিলেন। পাত্তা দেননি। যেমন দেন না দুই সন্তান নিয়ে সকাল থেকে রাত সংসার সামলানো মায়েরা। কারণ পরিবারের সকলের প্রয়োজন মিটিয়ে নিজের দিকে তাকানোর, নিজের শরীরের কথা ভাবার ফুরসত নেই তাঁদের। ওই মহিলাও সেদিন ভাবেননি। শারীরিক ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে গিয়েছেন। কাজ করতে হবে ভেবে করেও গিয়েছেন। শেষে আট ঘণ্টা পরে থামতে হয়েছে। কারণ সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে তাঁর শরীর!
ওই মহিলার বয়স ৩৬। তাঁর দুই সন্তানের বয়সও খুব বেশি নয়। তাঁর সঙ্গে যা হয়েছে, সেই ঘটনাটি নিজের সমাজমাধ্যমে বলেছেন এক চিকিৎসক, যিনি ঘটনাটি সামনে থেকে দেখেছেন। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারি হাসপাতালের ওই চিকিৎসকের নাম ওবাইদুর রহমান। তিনি বলছেন, ‘‘অনেকেই ভাবেন হার্ট অ্যাটাক হলে বুকে ব্যথা হবে। সে দিন সকাল থেকে ওই মহিলা কোনও রকম ব্যথা অনুভব করেননি। তিনি শুধুই বার বার ঝিমিয়ে পড়ছিলেন।’’
এক কাপ চা বা কফি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে গোছের ঝিমুনি নয়। এ ঝিমুনি অনুভূত যাচ্ছিল গোটা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। চিকিৎসকের কথায়, ‘‘ওঁর হাত ভারী লাগতে শুরু করেছিল। শরীরে কিছুই জুতসই লাগছিল না। প্রচুর পরিশ্রম করার পরে দিনের শেষে শরীরে যেমন ক্লান্তি আসতে শুরু করে, সকাল ১০টা থেকেই তেমন লাগছিল। অথচ তখনও ওই মহিলা নিজেকে বোঝাচ্ছিলেন, তিনি ক্লান্ত। কিন্তু দুপুর গড়াতেই অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে।
দুপুরের পরই মহিলার মাথাঘোরা, বমিভাবের মতো সমস্যা শুরু হয়। কিন্তু ততটা জোরালোও নয় যে, বমি হয়ে যাবে। শুধু প্রবল অস্বস্তি। কোনও এক জায়গায় ধীর স্থির হয়ে বসতে না পারার মতো অস্বস্তি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, এই পর্বে রোগীর জ্বর আসেনি, পেটে কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু সময় যতই গড়াতে থাকে, তত তাঁর শ্বাস নিতেও ধীরে ধীরে অসুবিধা হতে শুরু করে। খুব যে হাঁসফাঁস করার মতো সমস্যা, তা কিন্তু না। শুধুই একটা অস্বস্তি। ভাল ভাবে পরিপূর্ণ শ্বাস নিতে না পারার অস্বস্তি।
শেষের দিকে তিনি বার বার বসছিলেন আর উঠছিলেন। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারপরেও তিনি ভয় পাননি। কী হতে পারে ভেবে আতঙ্কিত হননি। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে তো ভাবেনইনি। কারণ, চিকিৎসকের মতে, ‘‘৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এক জন ৩৬ বছর বয়সি মহিলা ভাববেন না, তাঁর আচমকা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। অথচ মহিলাদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই হার্টের রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হল— অত্যধিক ক্লান্তি, বমি-ভাব, মাথাঘোরা এবং শ্বাস নেওয়ার সমস্যা।’’
যেহেতু এই তথ্য অনেকেই জানেন না, তাই প্রথমেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা ভাবেন না। ওই মহিলাও ভাবেননি। কিন্তু আট ঘণ্টা পরে তাঁর হার্ট কাজ করা প্রায় বন্ধ করে দেয়। তখন তাঁকে বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে।
কেন এমন হয়?
চিকিৎসক জানিয়েছেন, ওই মহিলার যে ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাকে বলা হয় অ্যাটিপিকাল মায়োকার্ডিয়াল ইসকেমিয়া। এই ধরনের হার্ট অ্যাটাক মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুকে ব্যথা হয় না। আর সে জন্যই এই হার্ট অ্যাটাক বিপজ্জনক হতে পারে এবং তা থেকে মৃত্যুও হতে পারে।
আরও পড়ুন:
কাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি?
মহিলা: এই রোগে মহিলারাই আক্রান্ত হন সবচেয়ে বেশি। মূলত অতিরিক্ত ক্লান্তি ভাব, মাথাঘোরা, বমি-ভাব এবং শ্বাস নেওয়ার অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা যায়। বুকে ব্যথা হতে পারে। তবে না হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে বেশি।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে: বয়স্কদের এই ধরনের হার্ট অ্যাটাকে কোনও উপসর্গই প্রায় বোঝা যায় না। তাঁদের ক্ষেত্রে ওই রোগকে বলা হয় সাইলেন্ট ইসকেমিয়া।
ডায়াবিটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে: এঁদের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথাবোধ না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রেও এঁরাও উপসর্গহীন এই হার্ট অ্যাটাক বা সাইলেন্ট ইসকেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
কেন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?
হার্ট অ্যাটাকের রোগীর সুস্থতা নির্ভর করে সঠিক সময়ে রোগীর চিকিৎসা শুরু হল কি না, তার উপরে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময়েই বুকে ব্যথা না হওয়ায় সমস্যাটি যে হার্ট সংক্রান্ত তা বুঝতে দেরি হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে হার্টের পেশির ক্ষতি হতে পারে। যা অনেক ক্ষেত্রে মারণও হতে পারে।