প্রতি দিনের যাপনের সঙ্গে যুক্ত অনেক কিছুই শরীরে হরমোনের ওঠাপড়া নিয়ন্ত্রণ করে। সেগুলি না জানলে বা সতর্ক না হলেই নিঃশব্দে বাড়তে পারে শারীরিক সমস্যা। ঠিক যেমন থাইরয়েডের অসুখ। ডায়াবিটিসের মতোই এই সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরক্সিন হরমোনের মাত্রার তারতম্য হলে তার প্রভাব পড়ে শরীরে। হরমোন বেশি নিঃসরণ হলে এক রকম সমস্যা হয়, মাত্রা কমে গেলে হয় আর এক রকম। কেউ স্থূলত্বের সমস্যায় ভোগেন, কারও আবার ওজন কমে যায়।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে হৃৎস্পন্দন ঠিক রাখা, বিপাকক্রিয়া- এই সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় থাইরয়েড গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনের দ্বারা। সেই কারণে হরমোনের মাত্রার হেরফের হলে ক্লান্তি, উদ্বেগ, বুক ধড়ফড়ানি, অল্পেই ঠান্ডা লাগা, ত্বক রুক্ষ হয়ে যাওয়া-সহ নানা রকম উপসর্গ দেখা দেয়। সময় থাকতে থাইরয়েডের চিকিৎসা না করালে শারীরিক সমস্যা বাড়তে পারে।
ভুবনেশ্বরের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট অঙ্কিতা তিওয়ারি এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস বা পরিস্থিতি নিঃশব্দে থাইরয়েডের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
কম ঘুম: কারও ঘুম কম হয়, কারও আবার ঘুম আসতেই চায় না, বিশেষত বয়স্কদের। আবার অনেকের কম ঘুমের কারণ সময়ের অভাব, চাকরির শিফ্ট। ফলে দেখা যায় ছোট থেকে বড় এবং বয়স্ক— অনেকেই ৮ ঘণ্টা ঘুমের সময়সীমা পূরণ করতে পারছেন না। দিনের পর দিন কম ঘুমের মাসুল দিতে হতে পারে নানা ভাবে। ঘুম পর্যাপ্ত না হলে শুধু শরীর বিশ্রাম পায় না তা নয়, থাইরক্সিন-সহ একাধিক হরমোনের ভারসাম্য এতে নষ্ট হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসক।
অঙ্কিতা বলছেন, ‘‘প্রতি দিন সাত ঘণ্টার চেয়ে কম ঘুম হলে থাইরয়েড নিঃসরণেই সমস্যা হতে পারে, তার মাত্রা কমে যেতে পারে। থাইরয়েড হরমোন শরীরে ঠিকমতো কাজ করতে না পারলে ধীরে ধীরে নানা সমস্যা শুরু হবে।’’
দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ: মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তাও থাইরয়েডের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। সাময়িক দুশ্চিন্তার ধাক্কা শরীর সামলে নিতে পারলেও, তা দীর্ঘস্থায়ী হলেই সমস্যা বাড়বে। উদ্বেগ, মানসিক চাপ থাইরয়েডের নিঃসরণে প্রভাব ফেলে। কারও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ থাকলে, সমস্যা হতে পারে গুরুতর। অনেক সময় পরিস্থিতিগত কারণে দু্শ্চিন্তা, মানসিক চাপ এড়ানো যায় না। তবে শরীরচর্চা, প্রাণায়ামে মনকে শান্ত রাখা যায়।
কড়া ডায়েট বা না খাওয়া: অনেকেই দীর্ঘ সময় না খেয়ে খাকেন, কী খাচ্ছেন তারও ঠিক থাকে না। দিনের পর দিন খাওয়ার অনিয়মও থাইরয়েডের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষত খাবারে যথাযথ পুষ্টির অভাব হলে সমস্যা বাড়ে। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমাতে গিয়ে কড়া ডায়েট করলেও সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসকের কথায়, খুব কম খেলে বা ১০০০ ক্যালোরির কম খাবার শরীরে গেলে শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য শক্তির অভাব হবে। তার প্রভাব পড়বে থাইরয়েড গ্রন্থির কাজেও। হঠাৎ করেই কমে যেতে পারে বিপাকহার।
ভুল সাপ্লিমেন্ট: কেউ রোগা হতে সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন, কেউ পেশি ফোলাতে সেটির ব্যবহার করছেন। চিকিৎসক সতর্ক করছেন, অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লিমেন্টের ব্যবহার হরমোনের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তার ফলে মারাত্মক হেরফের হতে পারে হরমোনে। প্রভাব পড়তে পারে থাইরয়েড গ্রন্থির কাজেও। তাই সাপ্লিমেন্ট নিতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মানা জরুরি।
শরীরচর্চার অভাব: অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং শরীরচর্চার অভাব পরোক্ষ ভাবে থাইরয়েডের সমস্যা বাড়তে পারে। শরীরচর্চা করলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা ঠিক থাকে। শরীর সুস্থ থাকলে, হরমোনের ভারসাম্যও ঠিক থাকে।