মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে কাজে ফেরা একজন মায়ের জন্য নতুন ম্যারাথন শুরু করার মতো। এক দিকে অফিসের ডেডলাইন, অন্য দিকে নিজের ও শিশুর শরীরের যত্ন নেওয়া, পুষ্টির খেয়াল রাখাও জরুরি। তবে কাজের চাপে নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা সব সময়ে সম্ভব হয় না। কিন্তু এই পর্বে নতুন মায়েদের শরীরে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের চাহিদা সবচেয় বেশি থাকে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মায়েদের যে পরিমাণ ক্যালোরি দরকার, সন্তানের জন্মের পরে তাঁদের আরও বেশি ক্যালোরি প্রয়োজন। আর তা কেবল পুষ্টিকর খাওয়াদাওয়া থেকেই আসবে। সময়ের অভাবে বাইরের খাবার বেশি খেয়ে নেওয়া বা দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে।
কেমন খাওয়াদাওয়া করবেন নতুন মায়েরা?
নিয়মিত অফিস করা, কম ঘুমোনো, সন্তানের দায়িত্বপালন, সব মিলিয়ে ক্লান্তি বাড়বে। পুষ্টির অভাবও হবে। যে মায়েরা সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছেন, তাঁদের এই পর্বে খাবারে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস যথাযথ পরিমাণে থাকছে কি না, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এই মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের মধ্যে জরুরি আয়রন, ক্যালশিয়াম ও আয়োডিন। এই বিষয়ে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল কলেজের (আইসিএমআর) একটি নির্দেশিকা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিশুর জন্মের প্রথম ছ’মাস মায়েদের দৈনন্দিন ৬০০ ক্যালোরি বা তারও বেশি প্রয়োজন। কোষের পুনর্গঠনের জন্য ও পেশির জোর বৃদ্ধিতে রোজ ১৩.৬ থেকে ১৭ গ্রাম অবধি প্রোটিন ও ৩০ গ্রামের মতো ফ্যাট প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
তবে মায়ের ডায়েট ঠিক করার আগে তাঁর শরীরে অন্য কোনও রোগবালাই আছে কি না, সেটা দেখে নেওয়াও প্রয়োজন। তবে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ মায়ের ওজনের উপরেও নির্ভর করে। তাই পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে ডায়েট চার্ট তৈরি করে মেনে চলা উচিত।
কী কী খাবেন মায়েরা?
দুধ, দই, ডিম, ছানা, চিজ়, জিয়ল মাছ রাখতে পারেন রোজকার খাবারে। আয়োডিন ফর্টিফায়েড নুন রাখা যেতে পারে মায়ের খাদ্যতালিকায়।
আয়রন সমৃদ্ধ খাবারও রাখতে হবে। কারণ সি-সেকশন বা নর্মাল ডেলিভারির সময়ে মায়েদের অনেকটা রক্তপাত হয়। সে কারণে রোজের পাতে আয়রন থাকা ভীষণ জরুরি। প্রতি দিন অন্তত একটি করে ডিম খাওয়ার চেষ্টা করুন। ডিমের কুসুমে ভাল পরিমাণে আয়রন থাকে। ছোট মাছ, মুরগির মাংস রাখা যেতে পারে। নিরামিষ খেলে পালং শাক, লাল শাক, কলমি শাক, কুমড়োর বীজ, তিল, কাঠবাদাম রাখতে পারেন রোজের খাদ্যতালিকায়।
এ সময়ে খাদ্যতালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারও রাখতে হবে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকবে না। শিম, বেগুন, লাউ, ঝিঙে, কুমড়ো, পটলের মতো সব্জি রাখতে পারেন রোজের পাতে। ফলের মধ্যে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল অর্থাৎ মুসাম্বি, পেয়ারা খেতে পারন। ফলের মধ্যে আপেল, বেদানা খেতে পারেন।
অফিসের ডেস্কে বা ব্যাগে একটি ছোট বাক্সে কাঠবাদাম, রোস্টেড ছোলা, মাখানা, খেজুর বা ঘরে তৈরি প্রোটিন বার রাখতে পারেন।
সারা দিনে অন্তত তিন থেকে সাড়ে তিন লিটার জল পান করতেই হবে। ডিটক্স পানীয় সঙ্গে রাখলে জলশূন্যতার ঝুঁকি থাকবে না। তবে ঘরে তৈরি ডিটক্স পানীয়ই পান করবেন।
কী কী করবেন না?
তেলমশলা দেওয়া খাবার, জাঙ্ক ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, দোকান থেকে কেনা চিনি দেওয়া পানীয়, নরম পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের রস একেবারেই খাবেন না।
সকালের জলখাবার বাদ দিয়ে শুধু কফির উপর ভরসা করবেন না। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গিয়ে পরে মারাত্মক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
সারা দিন একই ভাবে বসে থাকবেন না, মাঝে উঠে ঘোরাফেরা করুন। হালকা স্ট্রেচিংও করতে পারেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে।
ধূমপান এই সময়ে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই যে কোনও রকম নেশাই এড়িয়ে চলা ভাল।
মানসিক চাপ যাতে না হয়, সে চেষ্টা করা ভাল। অযথা দুশ্চিন্তা মা ও সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সারা দিনে অন্তত ১৫-২০ মিনিট মেডিটেশনের জন্য রাখুন। বা ওই সময়ে নিজের পছন্দের কাজ করার চেষ্টা করুন। মন ভাল থাকলে শরীরও ভাল থাকবে।