ক্লান্তি, মানসিক চাপ, কাজের চাপ, কোভিড অতিমারির প্রভাব— এমনই নানা কারণে কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ছোটখাটো থেকে বড়সড় বিষয় মাথা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে জেনে রাখা ভাল, এই সমস্ত সমস্যার নেপথ্যে একটি অতি নিরীহ, সহজ কারণও লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সে দিকে চট করে নজর যায় না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সমস্যা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কী কারণে মস্তিষ্ক কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে?
এর মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে চোখের সামনেই। আপনার ডেস্কে বা ব্যাগে থাকা জলের বোতলে। পর্যাপ্ত জল না খেলে, দেহে জলশূন্যতা তৈরি হলে শরীরের নানা অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মস্তিষ্ক তো বটেই।
শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দিলে কী হয়? ছবি: সংগৃহীত
পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের মতে, মধ্যবিত্ত কর্মজীবীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি হচ্ছে আজকাল। তার কারণ, ডেস্কে বসে কাজ হোক বা বাইরে বাইরে ঘুরে কাজ, তাঁরা দিনভর নিজের প্রতি যত্নবান হতে পারছেন না। দীর্ঘ ক্ষণ যাতায়াত, অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর ঘন ঘন চা-কফির অভ্যাসের কারণে শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এবং এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। বড় কোনও শারীরিক সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত চোখেই পড়ছে না। আর উপেক্ষিত হতে হতে শরীরে অকালবার্ধক্যের ছাপ পড়ে, নানা ধরনের মারাত্মক রোগ তৈরি হতে পারে, এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
মস্তিষ্কের সঙ্গে দেহের জলশূন্যতার সম্পর্ক কী?
ধরা যাক, দেহে জলশূন্যতার সমস্যা শুরু হয়েছে। কিন্তু গুরুতর নয়। এমন অবস্থাতেও পুরোপুরি কোনও কাজে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। যাঁরা কাজের মধ্যে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দেহে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা ভীষণ দরকারি। নয়তো কগনিটিভ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। পুষ্টিবিদের কথায়, ‘‘শরীরের ওজনের মাত্র ২ শতাংশ জল কমে গেলেই তাকে জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন হিসাবে ধরা হয়। আর বিশেষ এই পরিস্থিতি আমাদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের মতো মানসিক সক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৬০ কেজি ওজনের এক মহিলার ক্ষেত্রে মাত্র ১.২ লিটার জলের পরিমাণ কমে গেলেই এই সমস্যা শুরু হতে পারে। কর্মব্যস্ত দিনে টেরই পাওয়া যায় না সেটা। তাই সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে সারা দিন নিয়ম করে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খেতেই হবে।’’ আসলে জলের অভাবে দেহের কোষের স্তরে তথ্য বা সঙ্কেত আদান-প্রদানের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের নিউরনগুলি সচল থাকলেও তাদের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং একই কাজ করতে শরীরের অনেক বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। ঠিক এই কারণেই শরীরে তরলের মাত্রা কম থাকলে ভাবনাচিন্তা করা, মনে রাখা অথবা হিসাব-নিকাশ করার মতো কাজ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কী ভাবে দেহের জলশূন্যতা টের পাবেন?
১. পিপাসা: জলশূন্যতার প্রথম লক্ষণ হল, প্রবল জল পিপাসা। কিন্তু যত ক্ষণে জল তেষ্টা পাচ্ছে, তত ক্ষণে শরীর কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করে দিয়েছে। তাই কেবল পিপাসা পাওয়ার অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
২. প্রস্রাবের রং: সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। প্রস্রাবের রং যদি গাঢ় হয়ে পড়ে, তা হলে বুঝবেন, আপনার শরীরে জলের প্রয়োজন।
৩. চামড়া: হাতের পিছনের অংশে বা পেটের চামড়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য চিমটি কেটে রাখুন। ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি দেখেন, আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীরে তরলের পরিমাণ ঠিক আছে। কিন্তু চামড়া যদি কুঁচকানো অবস্থায় বেশ কিছু ক্ষণ ঝুলে থাকে বা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়, তবে এটি জলশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অবশ্য এই পরীক্ষা খুব ভরসাযোগ্য নয়, কারণ তাঁদের ত্বক এমনিতেই কুঁচকে থাকে।