অশীতিপর হলেও অভিনয়ে অমিতাভ বচ্চনের ক্লান্তি নেই। তবে এই বয়সে এসে সারাদিন কাজ করলে শরীর ক্লান্ত হয়েই পড়ে। মুশকিল হল, কাজের ক্লান্তি কাটাতে যখন ঘুমের দরকার হয়, তখন দু’চোখের পাতা কিছুতেই এক করতে পারেন না অমিতাভ। তবে সম্প্রতি তিনি নিদ্রাহীন রাতের ‘ওষুধ’ পেয়েছেন। অমিতাভ জানিয়েছেন, সেই ওষুধ সপ্তসুরের ডিঙায় শুধু তাঁর শরীর নয়, তাঁর আত্মাকেও স্পর্শ করছে এবং শান্ত করছে। যাতে চোখ জুড়ে নামে নিবিড় বিশ্রামের ঘুম।
অমিতাভ তাঁর নির্ঘুম রাতের অস্বস্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে তিনি ঘুমকে অবহেলা করেছেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে লিখেছেন, ‘‘দিনভর কাজের পরে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত আর ঘুম আসতে চায় না। অথচ মেডিক্যাল সায়েন্স বলছে, অন্তত ৭ ঘণ্টার ঘুম দরকার। কারণ, ওই সময়ে শরীর নিজেকে মেরামত করে, নিজেকে ভাল রাখার জন্য গুছিয়ে নেয়। তা হলে কী করা যেতে পারে! কাজকে তো আর অগ্রাহ্য করতে পারি না।’’
তা হলে নিদ্রাহীন রাতের কষ্ট দূর করতে কী করেন অভিনেতা? ব্লগে সে প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন অমিতাভ। তিনি জানিয়েছেন, মন শান্ত করতে তিনি কিছু ধ্রুপদী যন্ত্রসঙ্গীত শোনেন। কখনও সেতার, কখনও স্লাইড গিটার অথবা কোনও একটি বাদ্যযন্ত্রে বাজানো সুর। অমিতাভ লিখেছেন, ‘‘সঙ্গীতের থেকে ভাল আত্মার ওষুধ আর কী হতে পারে। সুরই আত্মাকে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম করে। সুর হল এমন এক অদৃশ্য সুতো, যার টান অন্তর পর্যন্ত অনুভব করা যায়। দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, সাত সুর গোটা মানবজাতিকে একাত্ম করতে পারে। অন্তত আমি তা-ই মনে করি। সুরকে যদি সম্মান করো, তবে সুরও তোমাকে ভালবাসবে।’’
অমিতাভ জানিয়েছেন, রাতে যখন তাঁর ঘুম আসে না, তিনি ওই ধরনের যন্ত্রসঙ্গীত চালিয়ে শুয়ে থাকেন। ধীরে শরীর শিথিল হয়, শান্ত হয় মন, ঘুম নামে চোখে। কিন্তু ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কি সত্যিই নিবিড় ঘুমের ‘ওষুধ’ হতে পারে?
ভাল ঘুমের পদ্ধতি নিয়ে চর্চাকারী চিকিৎসক ম্যাট ওয়ার্কার জানাচ্ছেন, সঙ্গীত মন শান্ত করে— এই কথাটি খুব উপর উপর বলা হবে। বিজ্ঞান বলছে, যন্ত্রসঙ্গীত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, হৃৎস্পন্দনের ছন্দ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এই সব কিছুই শরীরকে বিশ্রামের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক প্রয়োজন। তাই এগুলি ঠিক ভাবে হলে ঘুমোনোর আদর্শ অবস্থায় যেতে পারে শরীর।
আর এক ঘুম নিয়ে চর্চাকারী এবং মনোবিদ স্টেফানি রমিসজিউস্কি আবার মনে করেন, ঘুমোনোর জন্য সঙ্গীতে পুরোপুরি ভরসা করা উচিত নয়। তবে ঘুমোনোর আগে মন শান্ত করার জন্য কিছু কিছু সঙ্গীত কাজে লাগতে পারে।
সুর কী ভাবে ভাল ঘুমে সাহায্য করে?
মানসিক শান্তি
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরের প্রাথমিক পর্যায়ের চলন খুব ধীর এবং সুশৃঙ্খল। সারাদিনের কাজের চাপ এবং নানা দুশ্চিন্তার পরে মস্তিষ্ক যখন ক্লান্ত থাকে, তখন ওই সুরের মূর্ছনা স্নায়ুকে শান্ত হতে সাহায্য করে। যন্ত্রে ধীর লয়ের আলাপ শুনলে মনের অস্থিরতা কমে আসে, যা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে।
হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ছন্দ হৃৎস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। সুরের সঙ্গে তাল মিললে রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে। শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যায়। আর শরীর পুরোপুরি শিথিল হলে আপনা হতেই গভীর ঘুম নেমে আসে চোখে।
সুখী হরমোন বৃদ্ধি
ধ্রুপদী সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্কে এমন কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মন ভাল রাখতে এবং ব্যথা বা অস্বস্তি ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করে। এটি মনে এক ধরনের তৃপ্তি বা আনন্দের অনুভূতি দেয়, যা ঘুমের ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।
সুরের সময়
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাগ দিনের নির্দিষ্ট সময়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি। রাতের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কিছু রাগ শুনলে শরীরের যে নিজস্ব ঘড়ি, তা বুঝতে পারে, সময়টি বিশ্রামের। ফলে স্নায়ুর সচেতন ভাব কাটে। ঘুম নামে।