বয়স ৩২ হয়নি। কোমরের ব্যথায় কাতর আইটি কর্মী তন্নিষ্ঠা। পরীক্ষায় ধরা পড়েছে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি।
বছর ৩৫-এর অম্লান আচমকাই রোগা হতে শুরু করেছিলেন। তা দেখেই অনেকে স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরামর্শ দেন। ধরা পড়ে ডায়াবিটিস।
বছর ৩৪-এর অভয়ের শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণের।
এই বয়সের তরুণ-তরুণীরা চনমনে থাকার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে এত রোগ! তিনটি ঘটনা আলাদা হলেও মিল একটাই। প্রত্যেককেই কাজের জন্য রাতের শিফ্ট করতে হয়।
চিকিৎসকেরা বলছেন, বিপদ ঘনাচ্ছে সেখানেই। রাত ঘুমোনোর সময়। রাতে জেগে থাকতে গিয়ে উল্টো দিকে ঘুরছে শরীরের ঘড়ি। তার সঙ্গে শরীরের ছন্দ মিলছে না কিছুতেই। হায়দরাবাদের গান্ধী মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, রাত জেগে দিনের পর দিন কাজ করার ফলে তৈরি হচ্ছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করছে না), বাড়ছে কোলেস্টেরলের মাত্রা, ঠিক থাকছে না হরমোনের মাত্রাও।
আরও পড়ুন:
কারণ হিসাবে বায়োলিজক্যাল ক্লক বা শরীরের ঘড়ির ছন্দপতনকেই দায়ী করা হচ্ছে। কারণ, ঘুমোনোর সময়ে যেমন কিছু হরমোন নিঃসরণ হয়, তেমন জেগে থাকাকালীনও কিছু হরমোন ক্ষরিত হয়। প্রত্যেকের বায়োলজিক্যাল ক্লকের বিশ্রামের সময়েও পার্থক্য আছে। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ এন্ড্রোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজ়ম’-এর এর একটি গবেষণালব্ধ ফলে প্রকাশ, রাতভর কাজ করতে গিয়ে হরমোন এবং বিপাকহারের সামঞ্জস্য নষ্ট হচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ প্রজন্মও।
একটানা বসে কাজ করার ফলে শরীরে নানা রকম সমস্যা হয়। তবে সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দিনের বেলা যাঁরা কাজ করেন তাঁদের চেয়ে রাতের শিফটের কর্মীদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট বেশি বাড়ছে। তৈরি হচ্ছে টাইপ ২ ডায়াবিটিসের ঝুঁকি। বাড়ছে ট্রাইগ্লিসারয়েড যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বা়ড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ। রোদ লাগছে না বলেই কমছে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা।
কিন্তু চাইলেই তো পেশা বদল সম্ভব নয়। তা ছাড়া, রাতের কাজেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। না হলে ভেঙে পড়তে পারে বিভিন্ন পেশার পরিকাঠামো। ঠিক সেই কারণেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন জীবনযাপন সম্পর্কে। রাতের শিফ্টে কাজ করলেও শরীর ভাল রাখতে কী করবেন?
ঘুমে নজর: দিন হলে শরীর বোঝে এটা তার জাগার সময়। স্বাভাবিক ভাবেই সকালে অনেকেরই ঘুম আসতে চায় না। কিন্তু ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম সুস্থ থাকার জন্য জরুরি। ফলে দিনের বেলা ঘুমোতে গেলে ঘরের পরিবেশ রাতের মতো করে নিন। জানলা-দরজা দিয়ে ঘর অন্ধকার করে নিলে ঘুম আসতে সুবিধা হবে।
খাবার: রাত জাগতে গিয়ে ঘন ঘন ধূমপান, বার বার চা-কফিতে চুমুক দিলেও সমস্যা অনিবার্য। অতিরিক্ত ক্যাফিন শরীরের পক্ষে ভাল নয়। তাই রাত জাগলেও ঘন ঘন চা-কফি খাওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত জল খাওয়া জরুরি। ঘুম তাড়াতে চিনি ছাড়া কালো কফি বা গ্রিন টি-তে ২-৩ বার চুমুক দেওয়া যেতে পারে। রাত জাগলে হজমের সমস্যা হওয়া সম্ভব। তাই পুষ্টিকর এবং সহজপাচ্য খাবার দিয়ে নৈশভোজ সারা ভাল।
শরীরচর্চা: রাতভর কাজের পর ক্লান্ত থাকে শরীর। তা ছাড়া শরীরচর্চার আলাদা করে সময় মেলে না। চাইলে বা়ড়ি ফেরার সময় কিছুটা অন্তত হাঁটাহাটি করা যায় কি না দেখুন। ঘুমিয়ে উঠে বা বিকালের দিকে শরীরচর্চা করা যেতে পারে। ভিটামিন ডি-এর অভাব দূর করতে ছুটির দিনগুলিতে নিয়ম করে রোদে বেরোনো দরকার।
প্রাণায়াম: শরীর-মন সতেজ থাকে যোগাসন এবং প্রাণায়াম করলে। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম অভ্যাস করলে মানসিক স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। মানসিক চাপ শরীরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে। সেই কারণেই প্রাণায়াম অভ্যাস করা ভাল।
স্বাস্থ্যপরীক্ষা: রাতভর কাজে যেহেতু স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে তাই বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো জরুরি। কোনও শারীরিক সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।