বয়স মোটে ৪৩। দার্জিলিংয়ের এই তরুণ গায়ক তথা অভিনেতাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তিনি কোনও জটিল অসুখে ভুগছেন। ২৪ ঘণ্টা আগে গানের অনুষ্ঠান সেরে বাড়ি ফিরেছেন। তার পরে চার বছরের কন্যার সঙ্গে তাঁকে খেলতেও দেখেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সেই প্রশান্ত রাতে ঘুমোতে গেলেন এবং আর উঠলেন না। রবিবার ভোরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে, প্রশান্তকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু আচমকা এমন ঘটনা ঘটল কী ভাবে?
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টই শিল্পীর মৃত্যুর কারণ। এ রোগে রোগীর হাতে খুব বেশি সময় থাকে না। তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু না করলে বিপদ বাড়তে পারে। প্রাণ সংশয়ও হতে পারে যখন তখন। যে কারণে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে আপাত রোগহীন, স্বাস্থ্যবান এক যুবক বাঁচার সময় পাননি। কারণ, অলক্ষ্যে ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে তাঁর ‘মৃত্যু বাণ’! যে বিপদ হয়তো আগে থেকে সতর্ক হলে এড়ানো যেত।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আসলে কী?
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা এসসিএ হল এমন একটি পরিস্থিতি, যখন আচমকাই হৃদ্যন্ত্রের সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এটি ঘটে মূলত অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের জন্য। বেঙ্গালুরু নিবাসী হার্টের চিকিৎসক নিরঞ্জন হিরেমাথ বলছেন, ‘‘এটি যখন ঘটে, তখন শ্বাস-প্রঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যাঁর হচ্ছে, তিনি তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারান। যদি সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ চিকিৎসা শুরু না করা হয় তবে মৃত্যুও হতে পারে।’’
কেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সময় কম পাওয়া যায়?
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট যখন হয়, তখন হার্ট আর পাম্প করতে পারে না। ফলে গোটা শরীরে রক্ত এবং রক্তের মাধ্যমে যে অনবরত অক্সিজেন যাওয়ার প্রক্রিয়া তা ব্যাহত হয়। অক্সিজেনের অভাবে শরীর কোনও কাজ করতে পারে না।
আরও পড়ুন:
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আর হার্ট অ্যাটাক কি এক?
মুম্বইয়ের খ্যাতনামী হার্ট সার্জন রমাকান্ত পান্ডা জানাচ্ছেন হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়। যখন কারও হার্ট অ্যাটাক হয়, তখন তাঁর হার্টের কোনও একটি অংশের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ধমনীতে ব্লকেজ তৈরি হয়। কিন্তু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট শুধু ব্লকেজ থেকে হয় না। যদিও হার্ট অ্যাটাকের পরে হার্টের কিছু ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বদল হলে তা থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।
অল্প বয়সে কার্ডিয়াক অ্যারাস্টের ঝুঁকি বাড়তে পারে কাদের?
প্রশান্তের বয়স ছিল ৪৩। চল্লিশোত্তীর্ণ এক জন যুবকের সামনে জীবনের অনেকটাই পড়ে থাকে। তাই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মতো সমস্যা যাতে না হয়, সে দিকে আগে থেকে সতর্ক হওয়া জরুরি। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন ওই বয়সে কিছু কিছু বিষয় অজান্তে এই মারণ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। সামলে চললে দূরে রাখা যায় রোগকে।
১। বর্তমানে যে কর্পোরেট কর্মসংস্কৃতি তাতে অনেকটা সময়েই ডেস্কে বসে কাজ করতে হয় অল্পবয়সিদের। এতে স্থূলত্ব বাড়ে। ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা কমে। ফলে বাড়ে ডায়াবিটিসের ঝুঁকি, যা হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুন:
২। ব্যস্ত জীবনে প্যাকেটজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন অনেকেই। কারণ তা দ্রুত তৈরি করে ফেলা যায়। কিন্তু ওই ধরনের খাবার বা ভাজাভুজি অথবা বেশি চিনি দেওয়া খাবারে কোলেস্টেরল, হাইপারটেনশন এবং স্থূলত্বের আশঙ্কা বাড়ে। এ থেকেও হৃদরোগে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩। মানসিক চাপ থেকে হতে পারে হাইপারটেনশন এবং অ্যারহিথমিয়াস, যা হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
৪। সিগারেটে থাকা নিকোটিন ধমনীর ক্ষতি করে। হার্টের উপর চাপ বৃদ্ধি করে। এর থেকে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হতে পারে, যা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের অন্যতম কারণ।
৫। নিয়মিত ৬ ঘণ্টার কম ঘুমোলেও কর্টিসলের মাত্রা বাড়তে পারে, যা রক্তচাপ বৃদ্ধি করে হার্টের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
৬। অতিরিক্ত মদ্যপান, এনার্জি ড্রিঙ্ক বা গাঁজা জাতীয় নেশা হার্টের অনিয়মিত স্পন্দনের কারণ। এ থেকেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সমস্যা হতে পারে।
৭। এ ছাড়া পরিবারের কারও হার্টের রোগের সমস্যা থেকে থাকলেও সতর্ক হওয়া উচিত।