দু’জনেই তাজমহলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সকাল ৭টা। সূর্যের লালচে আলোয় শ্বেতমর্মরের সাদা রং জাফরানি। শীতের সকালেও সাধারণ টি-শার্ট আর একটি টেরিলিনের প্যান্টের উপরে একখানি আলোয়ান জড়িয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রৌঢ়। পাশের মহিলার লাল রঙের সিন্থেটিকের শাড়িটি ঈষৎ উঁচু করে পরা। গোড়ালি দেখা যাচ্ছে। তাঁরও গায়ে কেবল একটি চাদর জড়ানো। দু’জনেরই পায়ে চটি, মোজা নেই।
পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাজমহলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন দু’জন। হঠাৎ ফিরলেন প্রৌঢ়। কাউকে খুঁজছেন। তার পরে এগিয়ে গেলেন একটু দূরে দাঁড়ানো যুবকের দিকে। প্যান্টের পকেট থেকে একটি ছোট্ট ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘এই ফোনে আমাদের একটা ছবি তুলে দিতে পারবেন? তাজমহলের সঙ্গে!’’
প্রেমের সৌধ। প্রেয়সী মুমতাজের স্মৃতিতে বানিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। সে কীর্তি গোটা দুনিয়ার কাছে প্রেমের প্রতীক হয়ে থেকে গেল। দেখলেন আর বিস্মিত হলেন মানুষ। তাজমহলের সামনে ছবি তুলেছেন কোটি কোটি যুগল। ছবি তুলেছেন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বেরাও। ব্রিটেনের বর্তমান রাজা চার্লস, তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী ডায়না, তাঁদের পুত্র এবং পুত্রবধূ উইলিয়াম ও কেট। এ ছাড়া হলিউড, বলিউড, রাজনীতির জগতের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তাজমহলের সঙ্গে ছবি তুলতে ভোলেননি। সস্ত্রীক ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে মার্ক জ়াকারবার্গ, টম ক্রুজ়, ক্যাথরিন জ়েটা জোনস, জুলিয়া রবার্টস, উইল স্মিথ, পারভেজ় মুশারফ, বিল ক্লিনটন, জাস্টিন ট্রুডো, লিওনার্দো দি ক্যাপ্রিও— কে নেই সেই তালিকায়। শীতের সকালে তাজমহল দেখতে আসা ওই দম্পতিরও ইচ্ছে হল, নিজেদের কাছে তাজমহল দর্শনের ওই স্মৃতিটুকু রেখে দেওয়ার।
ক্যামেরার দুর্বলতায় জাফরান রঙা তাজমহলের সামনে কালচে এবং প্রায় ঝাপসা হয়ে যান দু’জনেই। তবু ছবি ওঠে।
তাজমহলে ছবি তুলে প্রিন্ট করে দেওয়ার বহু পেশাদার আলোকচিত্রী ঘুরে বেড়ান। কয়েকশো টাকার বিনিময়ে খামে মুড়ে ছবি পৌঁছে দেন পর্যটকদের হোটেলের ঘরে। কিন্তু ওই দম্পতি কোনও কারণে সেই উপায় নিলেন না। হতে পারে তাঁরা কোনও হোটেলে ওঠেননি। হতে পারে ওই বাড়তি কয়েকশো টাকার বাজেট নেই তাঁদের। হতে পারে তাঁরা ওই মুহূর্তের ছবিটুকু ব্যক্তিগত রাখতে চান। তাই ফোনই ভরসা।
কিন্তু ফোন তো আর স্মার্টফোন নয় যে ঝকঝকে ছবি উঠবে। ছোট্ট রঙিন স্ক্রিনের নীচে ছোট্ট ছোট্ট বোতাম। তার ডিজিটাল ক্যামেরার মান ০.০৩ মেগাপিক্সেল। তার পরে এ বোতাম সে বোতাম টিপে দীর্ঘ মেনুর তালিকা থেকে ক্যামেরা বেছে নেওয়াই ঝক্কির। যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘‘এই ফোন কী ভাবে চালাতে হয় তা-ই ভুলে গিয়েছি।’’ সে কথা শুনেও প্রৌঢ় আশা ছাড়তে নারাজ। ক্যামেরা খুলতেই তিনি চলে যান সঙ্গীর কাছে। তাজমহলের দিকে পিঠ করে দাঁড়ান। ক্যামেরার দুর্বলতায় জাফরান রঙা তাজমহলের সামনে কালচে এবং প্রায় ঝাপসা হয়ে যান দু’জনেই। তবু ছবি ওঠে।
আরও পড়ুন:
অসীম আগ্রহে এগিয়ে আসেন প্রৌঢ় কেমন উঠেছে, দেখবেন বলে। পর্দার দিকে তাকাতেই ক্ষণিকের জন্য মুখ থেকে হাসি উবে যায়। ছবিতে তাজমহল স্পষ্ট। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা দু’জন দু’খানি কালো অবয়ব ছাড়া আর কিছু নয়। সেটি যে তাঁরাই, তা-ও বোঝার উপায় নেই। মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রৌঢ় আবার হেসে উঠলেন। খুশির হাসি। আরও একটা তুলে দেওয়ার বায়না করলেন না। বরং ওই হাসিটি নিয়েই মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন ঠিক আছে। এটাই তো দরকার ছিল। স্মৃতিটুকু। ফ্রেমবন্দি মুহূর্তটুকু। ওটা যে তাঁরাই সেটা আর কেউ না বুঝুক, তাঁরা তো বুঝবেন। সেটাই চিরকাল থেকে যাবে তাঁদের মনের খুব গোপন কোনও কুঠুরিতে।
এই গোটা ঘটনাটি রেকর্ড হচ্ছিল আরও একটি ক্যামেরায়। রেকর্ড করছিলেন যাঁর কাছে ছবি তোলার অনুরোধ এসেছিল তিনি বা তাঁর সঙ্গী। ভিডিয়োটি তিনি পোস্ট করেছিলেন নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে। সেখান থেকেই নেটাগরিকদের নজর কেড়েছে।
বেড়ানোর সময় ছবি তোলা এবং একটি নিখুঁত সুন্দর ছবি তোলার জন্য বহু সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করেন অনেকে। ভাল পোশাকে একের পর এক ছবি তুলতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায় ছবিটুকুই তোলা হল। সুন্দর জায়গায় প্রিয় মানুষের সঙ্গে যে সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে এসেছিলেন, সেটিই আর হয়ে উঠল না। তাজমহলের ওই দম্পতি বুঝিয়ে দিলেন ছবি নয়, বেড়ানোর স্মৃতিটাই আসল।