দৈত্যের মতো শরীর। বিশাল লম্বা হাত-পা। মুখের গড়নও লম্বাটে, অত্যধিক শক্ত চোয়াল। বজ্রগম্বীর কণ্ঠস্বর। গায়ের চামড়া পুরু। এমনটা চট করে দেখা যায় না। বিশ্বে খুব কম জনেরই হয়। এমন দশাসই চেহারার কারণ এক বিশেষ রোগ যা হরমোনের বদলের কারণে হয়ে থাকে। একে বলে অ্যাক্রোমেগালি। এ দেশে কুস্তিগীর দ্য গ্রেট খালির এ রোগ ছিল বলে শোনা যায়। হরমোনজনিত এক ব্যাধি যাতে শরীরের বাড়বৃদ্ধি থামতেই চায় না। আকারে-আয়তনে পেল্লায় এক শরীর তৈরি হয়। সময়মতো এর চিকিৎসা না হলে প্রাণহানিও হতে পারে। এই ধরনের হরমোন ঘটিত বিরল রোগ গোড়াতেই চিহ্নিত করতে এক নতুন পন্থা আবিষ্কার করেছে জাপান।
দুরারোগ্য ও বিরল রোগ ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) কাজে লাগানো হচ্ছে বিশ্বের নানা দেশেই। মানুষের বোধবুদ্ধিতে যা কুলোয় না, তেমনই অস্বাভাবিকতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চোখে ধরা পড়বে অনায়াসে। জিনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বদলও তার চোখ এড়িয়ে যাবে না। এআই-এর এই বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এ বার অ্যাক্রোমেগালির মতো বিরল রোগ ধরার পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। এমন এক এআই টুল তৈরি হয়েছে, যাকে হাতের উল্টো পিঠের ছবি দেখালেই সেই মানুষটির শরীরে কী কী রোগ বাসা বেঁধেছে, তা বলে দেবে। বিরল রোগ থাকলে সেটিও জানাবে। অ্যাক্রোমেগালির মতো রোগ ধরা পড়ে না চট করে। হরমোনের বদল আগে থেকে ধরা সম্ভবও নয়। সেই কাজও করানো যাবে জাপানি টুল দিয়ে।
আরও পড়ুন:
শরীরের যে বৃদ্ধি হয়, তার জন্য দায়ী কিছু ‘গ্রোথ হরমোন’। শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন এই হরমোনগুলির ক্ষরণ বাড়তে থাকে। ফলে শিশু উচ্চতা বাড়ে, শরীরের গড়ন তৈরি হয়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এই গ্রোথ হরমোনের কাজ ভিন্ন। এর নিঃসরণের হারও সীমিত। কোন বয়সে কতটা হরমোন নিঃসৃত হবে, তার নির্দিষ্ট মাপ আছে। অ্যাক্রোমেগালি রোগে এই হিসেবটা তছনছ হয়ে যায়। পিট্যুইটারি গ্রন্থিতে এমন টিউমার গজায় যে হরমোন বাঁধ ভাঙা বন্যার জলের মতো বেরোতে শুরু করে দেয়। এত পরিমাণে বেরোতে থাকে, যে শরীরের বাড়বৃদ্ধি থামতেই চায় না। হাত ও পায়ের দৈর্ঘ্য বেড়ে চলে, মুখ লম্বাটে হয়ে যায়, উচ্চতাও বেড়ে চলে অনিয়ন্ত্রিত ভাবেই। ফলে দৈত্যবৎ শরীর তৈরি হয়।
হরমোনের এই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা আরও অনেক রোগের জন্ম দিতে থাকে। যেমন হদ্রোগ দেখা দেয়, ডায়াবিটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। আচমকাই ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে। শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্তও হয়ে পড়তে পারে। সমস্যা হল, লম্বা-চওড়া চেহারা হয়ে যাওয়া মানেই যে তা অ্য়াক্রোমেগালি তা ধরা সহজ নয়। ফলে রোগ ধরা না পড়লে প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যায়। জাপানি বিজ্ঞানীরা এমন এআই টুল তৈরি করেছেন, যা হাতের উল্টো পিঠের ছবি দেখেই বলে দিতে পারে যে শরীরে হরমোনের অদলবদল ঘটেছে কি না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্য়াক্রোমেগালি রোগটি চিহ্নিত করা নিয়ে গবেষণাটি শুরু হয়, তবে এখন দেখা যাচ্ছে বিরল থেকে বিরলতম রোগ শনাক্ত করতেও এই টুলটি কাজে আসতে পারে। যদি সবক্ষেত্রে এটি কার্যকরীহয়, তা হলে রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি বার করে ফেলাও সহজ হবে।