টাইপ-২ ডায়াবিটিসের জন্য সব সময় কেবল জীবনযাত্রার ধরনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। বিশেষত, যদি হঠাৎ করে ৫০-৬০ বছর বয়সের পর ডায়াবিটিস ধরা পড়ে। এর নেপথ্যে যদি কোনও পরিচিত কারণ না থাকে, তা হলে বুঝতে হবে, শরীর বিশেষ সঙ্কেত দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এই নতুন ডায়াবিটিসই হতে পারে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের একেবারে প্রাথমিক লক্ষণ। তা ছাড়া যদি কারও ডায়াবিটিস থাকে, কিন্তু হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা হলে তার পিছনেও একই কারণ থাকতে পারে।
অগ্ন্যাশয় শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এখানেই তৈরি হয় ইনসুলিন। যখন অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন প্রথমেই এই ইনসুলিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। কখনও কখনও তার ফল হিসেবেও রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা বেড়ে যেতে পারে এবং ডায়াবিটিস ধরা পড়তে পারে। ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবিটিস একে অপরের কারণ এবং ফলাফল, দুই-ই হতে পারে।
ডায়াবিটিসের দিকে বিশেষ নজর থাকুক। ছবি: সংগৃহীত।
এক জন ক্যানসার চিকিৎসকের দৃষ্টি থেকে দেখলে বোঝা যাবে, কেন হঠাৎ করে শনাক্ত হওয়া ডায়াবিটিস নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। কলকাতার ক্যানসার চিকিৎসক সন্দীপ গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার সহজে ধরা পড়ে না। আগে থেকে শনাক্ত করা কঠিন। কিন্তু এই ক্যানসার হওয়ার আগে থেকে শরীর পরোক্ষ ভাবে সতর্কতা জারি করতে পারে। চিকিৎসকের কথায়, ‘‘একাধিক গবেষণায় যা দেখা গিয়েছে, তা বলি। ধরা যাক, ৫০-৬০ বছর বয়সি ব্যক্তির শরীরে হঠাৎ ডায়াবিটিস ধরা পড়েছে, বা নিয়ন্ত্রণে থাকা ডায়াবিটিস হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। তার পর আগামী ২-৩ বছর একটানা পর্যবেক্ষণে রাখার পর দেখা গিয়েছে, তাঁদের শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ৬-৮ গুণ বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’’ তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শে আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান করানো উচিত বলে মনে করছেন ক্যানসার চিকিৎসক।
তবে এই যুক্তিতে পুরোপুরি সহমত নন কলকাতার মেডিসিনের চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস। তাঁর কথায়, অবশ্যই সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এই যুক্তি সব সময়ে না-ও খাটতে পারে। কারণ, এখানকার পরিকাঠামোর অভাবে অনেক ব্যক্তিরই বেশি বয়সে গিয়ে ডায়াবিটিস ধরা পড়ে। সে ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনা তৈরি হয় না। যাঁরা নিয়মিত পরীক্ষা করাতে পারেন, তাঁদের জন্য এই যুক্তি ঠিক। কিন্তু গ্রামীণ পরিবেশে ডায়াবিটিসের পরীক্ষা করানোর প্রবণতা নিয়মিত নয়। হয়তো অনেক আগে থেকেই ডায়াবিটিস হয়ে রয়েছে, কিন্তু পরীক্ষা না করানোর কারণে ধরা পড়েনি।
তবে দুই চিকিৎসকেরই মত, সব ডায়াবিটিসই ক্যানসারের লক্ষণ নয়। বেশির ভাগ মানুষের ডায়াবিটিস দেখা দেয় খাদ্যাভ্যাস, ওজন বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বা বংশগত কারণে। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া ডায়াবিটিসের সঙ্গে যদি অজানা কারণে ওজন কমে যাওয়া, খিদে কমে যাওয়া, পেট বা পিঠে একটানা অস্বস্তি হওয়া থাকে, তা হলে সেটিকে সাধারণ সমস্যা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আরও পড়ুন:
তাই ক্যানসার চিকিৎসকের বক্তব্য, হঠাৎ ডায়াবিটিস ধরা পড়লে, বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিশ্চিন্তে বসে থাকা উচিত নয়। কারণ একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সে ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছে অনেকখানি।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের একটি বড় সমস্যা হল, এই রোগে শুরুর দিকে খুব স্পষ্ট লক্ষণ দেয় না। ফলে অনেক সময়েই রোগ ধরা পড়ে দেরিতে। সেই কারণেই চিকিৎসকেরা এখন নতুন করে ধরা পড়া ডায়াবিটিসকে আর হালকা ভাবে দেখছেন না। প্রয়োজনে রক্তপরীক্ষা ছাড়াও বিশেষ স্ক্যান বা আরও বিস্তারিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।