পশ্চিমের দেশগুলিতে শুধু নয়, বিশ্ব জুড়েই হামের প্রকোপ তীব্র। কোভিডের পরে হঠাৎ করেই হাম ও রুবেলার মতো রোগের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। সারা গায়ে র্যাশ বা ফোস্কার মতো হওয়া, সঙ্গে তীব্র জ্বর— হাম বলতে এই ধারণাই ছিল। ছোটবেলায় হাম বা পক্সে ভুগেছেন বেশির ভাগই। কিন্ত এখন এই রোগের চেহারা বদলেছে। সংক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে এবং শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও রোগটি হচ্ছে। সে কারণেই হাম নিয়ে এত আতঙ্ক ছড়িয়েছে। রোগটি নিয়ে সতর্ক করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)ও সেন্টার ফর ডিজ়িজ় কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি)।
মরসুম বদলাচ্ছে। এখানেও কি হামের ভয় আছে? চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদারের মত, কোভিডের কারণে টিকাকরণ অনেক জায়গাতেই পিছিয়ে গিয়েছিল। ফলে ফের এই সব রোগের প্রার্দুভাব দেখা দিয়েছে। তবে হামের টিকা (এমএমআর ভ্যাকসিন) নিয়ে রাখলে ভয় কম। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এমএমআর টিকার দু’টি ডোজ় নেন না অনেকে। সে ক্ষেত্রে সংক্রমণের ভয় থেকেই যায়। আর রোগের চরিত্র যে ভাবে বদলাচ্ছে, তাতে সাবধানে থাকতেই হবে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এখন এই সব রোগ হওয়ারও কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন-তখন হানা দিচ্ছে এই সব ভাইরাসঘটিত রোগ। এ দেশে শীতের সময়ে ও বসন্ত শুরু হওয়ার আগে হাম, পক্সের প্রকোপ বাড়ে। তবে যেহেতু এখন বিশ্বের নানা দেশেই হামের প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই সময় থাকতেই সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। জলবায়ু বদলের কারণে আবহাওয়া খামখেয়ালি, তার উপরে বাতাসে ভাসমান দূষিত কণা, বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। ভাইরাসও তার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছর ও তার কমবয়সি শিশুদের হাম হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে রোগটি এখন প্রাপ্তবয়স্কদেরও হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
লক্ষণ চিনতে হবে
তীব্র জ্বর আসবে আগে। চোখ লাল হয়ে ফুলে যাবে, অনবরত জল পড়তে থাকবে। কাশি সারতে চাইবে না, গলার স্বরে বদল আসবে। এর পর ধীরে ধীরে সারা গায়ে লালচে র্যাশ বা ফোস্কার মতো বেরোবে। ইদানীংকালে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিচ্ছে যেমন, তীব্র ডায়েরিয়া হচ্ছে, মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফ্যালাইটিসের লক্ষণও দেখা দিচ্ছে।
সতর্ক হতে হবে আগেই
সময়মতো টিকাকরণে অনেক ভাইরাসজনিত রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আর সাবধানতা হিসেবে রোগের লক্ষণ ধরা পড়ার পরে বাড়ির অন্য সকলকে একটু সতর্ক থাকা দরকার। ছোটদের হাম হলে তাদের আলাদা রাখতে হবে। এই রোগটি হাঁচি, কাশি থেকে ছড়াতে পারে। আবার আক্রান্তের ব্যবহার করা জিনিসপত্র থেকেও ছড়াতে পারে। হামের জীবাণু বাতাসে প্রায় এক ঘণ্টা সক্রিয় থাকে। কাজেই হাম হলে রোগীকে আলাদা রাখাই বাঞ্ছণীয়। রোগ ধরা পড়লে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে।
হামের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। সচেতন না হলে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগের লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
হাম হলে শরীরে জলের পরিমাণ কমে যায়। তাই বারে বারে জল ও তরল খাবার খাওয়া জরুরি। হামে আক্রান্ত রোগীদের ভিটামিন এ-র অভাব হতে পারে। তাই সে ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
টিকাকরণ নিয়ে সতর্কতা
হামের নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা নেই। রোগের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। টিকাকরণই এ ক্ষেত্রে বেশি জরুরি। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশু হামের টিকা এক ‘ডোজ়’ দেওয়ার পরেই তা বন্ধ করে দিয়েছেন অভিভাবক। সে ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরেও হাম হতে পারে। এ ছাড়া, টিকাকরণে কোনও ত্রুটি থাকলেও হাম হতে পারে। দু’ডোজ টিকা দিলে শিশু ৯৫- ৯৭ শতাংশ নিরাপদ। প্রথম ডোজ়টি সাধারণত ১২-১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে দ্বিতীয় বা বুস্টার ডোজ়টি ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে দেওয়া হয়। এই ডোজ়টি অবশ্যই নিয়ে রাখতে হবে।