অনেক ক্ষণ চেয়ারে বসে থাকার পরে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে মুখ বিকৃত হয়ে গেল! কারণ, ব্যথায় কোমর টনটনিয়ে উঠেছে কিংবা পিন ফোটার মতো অনুভূতি হচ্ছে হাঁটুর চারপাশে বা গোড়লির উপরে পায়ের গোছে।
৪০ বা ৫০ পেরোনোর পরে নয়, এমন ব্যথা আজকাল অনুভব করছেন কর্পোরেট অফিসে কর্মরত বছর ২৫ কি ৩০-এর তরুণ-তরুণীরাও। তাঁদেরও তরফেও শোনা যাচ্ছে— ‘কোমরটা ধরে গিয়েছে’ বা ‘পায়ে খুব ব্যথা’-র মতো কাতরোক্তি। যা কয়েক বছর আগে পর্যন্ত প্রৌঢ়ত্ব পেরনো মানুষজনের মুখেই সচরাচর শোনা যেত। কিন্তু ব্যথা এখন আর বয়স মানছে না।
জয়েন্ট পেন বা অস্থিসন্ধির ব্যথায় এখন কাতর হচ্ছেন ২০-৩০ বছর বয়সিরাও। অথচ ওই বয়সে শরীরে হাড় ও পেশির সবচেয়ে শক্তিশালী থাকার কথা, দুর্বলতার মোকাবিলা করার কথা সহজেই। কিন্তু এ যুগের জীবনযাত্রা এবং কিছু নিত্যনৈমিত্তিক ভুল তা হতে দিচ্ছে না। এতে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে পেশি এবং হাড়ের রক্ষাকবচ। ফলে দুর্বল হচ্ছে শরীর। ঠিক কোন কোন ভুল এই সমস্যার কারণ?
১. ‘নিষ্ক্রিয়’ জীবন
হয়তো আপনার মস্তিষ্ক প্রতি সেকেন্ডে অনেক কাজ করে চলেছে। কিন্তু শরীর নড়াচড়া করতে ভুলে যাচ্ছে। বিশেষ করে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে অফিসের চেয়ারে একটানা অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা আটকে থাকছে শরীর। কারও কারও ক্ষেত্রে এই মেয়াদ আরও দীর্ঘ এবং তার প্রভাব ‘ভয়াবহ’। আসলে এ যুগের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ আইটি অথবা ডেস্ক জবের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা হয়তো টানা ৭-৮ ঘণ্টা ভুল ভঙ্গিতেই বসে রইলেন চেয়ারে, ল্যাপটপের সামনে ঝুঁকে করেই চললেন কাজ। এতে যেমন ঘাড় ও পিঠের সমস্যা বাড়ছে। তেমনই পেশির এবং অস্থিসন্ধির সচলতাও কমছে। কারণ, সেগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে নড়াচড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না।
২. ভিটামিন-ডি
২০-৩০ বছর বয়সিরা এ যুগে দিনের বেশির ভাগ সময় থাকেন এসিতে বা চার দেওয়ালের মধ্যে। সূর্যের আলো গায়ে লাগে না। ফলে তা থেকে ভিটামিন-ডিও তৈরি হয় না শরীরে। অথচ হাড় এবং পেশির স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি ভিটামিন-ডি। যা না থাকলে শরীর ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারবে না। এতে হাড়ের ক্ষয় এবং অস্টিয়োম্যালেসিয়ার মতো হাড় নরম হওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকবে।
৩. স্থূলত্ব
ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবারের প্রলোভন চারপাশে। যত না স্বাদের জন্য খাওয়া, তার চেয়ে অনেক বেশি ‘ট্রেন্ড’-এ থাকতে খাচ্ছেন অল্পবয়সিরা। ফলে শরীরে ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ বাড়ছে। বাড়ছে মেদ। বাড়ছে স্থূলত্ব। আর ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তার পুরো চাপ পড়ছে হাঁটু এবং গোড়ালির ওপর। ২০ বছর বয়সেই যদি অস্থিসন্ধির উপর অতিরিক্ত ভার পড়তে শুরু করে, তবে স্বাভাবিক ভাবেই তার ক্ষয়ও শুরু হবে দ্রুত।
৪. শরীরচর্চা
শরীরচর্চা হয় না বললেই চলে। এ প্রজন্মের মধ্যে মূলত দু’রকমের সমস্যা দেখা যায়। হয় কেউ একেবারেই শরীরচর্চা করেন না, নয়তো পেশাদারদের পরামর্শ ছাড়াই জিমে গিয়ে ভারী ওজন নিয়ে ব্যায়াম করেন। মুশকিল হল এই যে, শরীরচর্চা না করলে যে ক্ষতি হয়, ভুল পদ্ধতিতে ব্যায়াম করলে তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হতে পারে। পেশিতন্তুতে আঘাত লাগতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিসন্ধির ব্যথাও হতে পারে ভুল ভাবে শরীরচর্চা করলে।
৫. ঘুম
এ প্রজন্ম মোবাইলে আসক্ত। তার উপর থাকে দৈনন্দিন জীবন থেকে আসা নানা রকমের মানসিক চাপ। সে চাপ কিছুটা কমাতে পারত পর্যাপ্ত ঘুম। কিন্তু মোবাইলের জন্য টান পড়ে সেই ঘুমেও। অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তির কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে। পেশিতে টান পড়ে এবং অস্থিসন্ধির ব্যথার উদ্রেক হয় সেখান থেকেই। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের পেশিতন্তু নিজেকে মেরামত করার সুযোগও পায় না।
প্রতিকার কী ভাবে
সমস্যার সমাধান করতে চাইলে নিত্যদিনের অভ্যাসে খুব ছোট ছোট কিছু বদল আনুন।
১। প্রতি দিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট টানা রোদে থাকার চেষ্টা করুন। আর কিছু না পারলে অন্তত পিঠে এবং কোমরে রোদ লাগান।
২। অনেক বার শুনেছেন কিন্তু পারেননি। কাজের ফাঁকে হাঁটতে না যেতে পারেন, প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫ মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়ান। সামান্য স্ট্রেচিং করুন। তা হলেও কিছুটা কাজ হবে।
৩। পর্যাপ্ত জল পান করুন। পেশিকে ভাল রাখতে এর থেকে ভাল সমাধান হয় না। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারদাবারও খেতে হবে।
৪। ঘুমের সঙ্গে আপস করবেন না। দিনে যে ভাবে হোক ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।