ঝকঝকে সুন্দর হাসি দেখতে কার না ভাল লাগে! ঝকঝকে হাসির সঙ্গে সুন্দর দাঁতের সম্পর্ক কিন্তু গভীর। সেই হাসিই ম্লান হতে শুরু করে যখন দাঁত পড়ে যায়। একটা সময় ছিল যখন কেবল বয়স্ক লোকেরাই দাঁত বাঁধাতেন। টেবিলে দিদিমা, ঠাকুরমাদের খোলা দাঁত অনেকেই দেখেছেন হয়তো। তবে ইদানীং দাঁত বাঁধাচ্ছেন ১৮ বছরের তরুণ-তরুণীরাও। কেবলই কি অযত্ন, না কি নেপথ্যে আরও কোনও গভীর কারণ রয়েছে?
দাঁতের যত্ন নিতে অনেকেরই অনীহা, দাঁতের যন্ত্রণা সহ্যের বাইরে গেলে তবেই অনেকে দাঁত নিয়ে ভাবেন, তার আগে নয়, এমনটাই মত প্রস্থোডনটিস্ট, ইমপ্ল্যান্টোলজিস্ট মুন চট্টরাজের। চিকিৎসক হলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রে গোড়াতেই গলদ থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ সময়। এখন বেশি বয়সে বাবা-মা হচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা। বয়স যত বাড়ছে, ধৈর্য ততই কমছে। শিশুকে চামচ-বাটির বদলে ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছেন তাঁরা। সেই বোতল মুখে নিয়েই শিশু ঘুমিয়ে পড়ছে কখনও কখনও। দুধের দাঁতের ক্ষয় হচ্ছে সেই কারণেই। নতুন যে দাঁত উঠছে, তাতেও তার প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া অনেকেই দু’বেলা ব্রাশ করছেন বটে, তবে ব্রাশ করার সঠিক পদ্ধতি না জেনেই। সারা ক্ষণ জাঙ্ক ফুড আর নরম পানীয় খাওয়ার অভ্যাসও এখনকার প্রজন্মের মধ্যে অনেকটাই বেশি, সেই কারণেই দাঁতের সমস্যা শুরু হচ্ছে। তা ছাড়া দাঁতে ব্যথা শুরু হলে অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে নিচ্ছেন, ফলে সাময়িক আরামবোধ হলেও ভবিষ্যতে কিন্তু বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’’
অল্প বয়সে দাঁত পড়ে যাওয়ার পিছনে রোজের জীবনে বাড়তি মানসিক চাপকেও দায়ী করছেন, এস্থেটিক ডেন্টাল সার্জন অনিরুদ্ধ মণ্ডল। চিকিৎসক বলেন, ‘‘কেবল অযত্ন বা খাওয়াদাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই দাঁত পড়ে যাচ্ছে এমনটা নয়। এখন অনেকেই ব্রাকসিজ়মে ভুগছেন। একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। অতিরিক্ত উদ্বেগ, রাগ বা মানসিক চাপের কারণে শরীরের পেশিগুলি সঙ্কুচিত হয়, যার ফলে অসচেতন ভাবেই মানুষ চোয়ালে চাপ দেয় বা দাঁতে দাঁত ঘষে। দীর্ঘ দিন ধরে এই রোগে ভুগলে দাঁতের ক্ষয় হয়। যাঁরা ধূমপান করছেন, তাঁদেরও অল্প বয়সে দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অল্পবয়সিরাও এখন ডায়াবেটিক। ডায়াবেটিক ক্রনিক ইফ্ল্যামেশনের কারণেও দাঁত পড়ছে সময়ের আগেই।’’
এখন প্রশ্ন হল কত বছর বয়স থেকে দাঁত ইমপ্লান্ট করানো যায়?
চিকিৎসকদের মতে, ১৮ বছরের আগে দাঁত ইমপ্লান্ট করানো যায় না। দাঁতের চিকিৎসায় একেবারে শেষ পর্যায় এসে ইমপ্লান্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অনিরুদ্ধ বলেন, ‘‘অল্পবয়সিদের এখন যে হারে দাঁত পড়ছে, তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। ৮ বছরের খুদে ক্লিনিকে আসছে রুট ক্যানাল করাতে। আবার ৪৫ বছর বয়সে একটাও দাঁত নেই, এমন রোগীরও দেখা মিলছে। তাই দাঁত নিয়ে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে অল্প বয়স থেকেই।’’
অল্প বয়সে দাঁত পড়ে যাওয়ার পিছনে রোজের জীবনে বাড়তি মানসিক চাপকেও দায়ী করছেন চিকিৎসকেরা। ছবি: সংগৃহীত।
কাদের ক্ষেত্রে দাঁতের ইমপ্লান্ট করা যাবে না?
১) যে ডায়াবেটিকদের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাঁদের ইমপ্লান্ট করানো বেশ ঝক্কির কাজ। এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষার ফলাফল ৭.৫-এর বেশি থাকলে তাঁদের সাধারণত ইমপ্লান্ট করানো হয় না।
২) যাঁদের ব্রাকসিজ়ম আছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও ইমপ্লান্ট করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে রোগী অসেচতন ভাবে দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাসের কারণে ইমপ্লান্ট খুলে গলায় আটকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
৩) অ্যালঝাইমার্সের মতো স্নায়ুঘটিত রোগের ক্ষেত্রেও ইমপ্লান্ট করানোর ক্ষেত্রে বেশ সচেতন থাকতে হয়। এই রোগের ক্ষেত্রে অনেক রোগীরই দাঁত বসানো সম্ভব হয় না।
৪) উচ্চ রক্তচাপ, লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা বেশি থাকলেও ইমপ্লান্টের বিষয়ে বেশ সচেতন থাকতে হবে। সেগুলি নিয়ন্ত্রণে এনে তার পরেই অস্ত্রোপচার করানো ভাল।
৫) সদ্য হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা স্টেন্ট বসেছে বা হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার হয়েছে, এমন সব ক্ষেত্রেও রোগীর ইমপ্লান্ট করানো সম্ভব হয় না।
এক বার ইমপ্লান্ট করালে তার রক্ষণাবেক্ষণ কি বেশ খরচসাপেক্ষ?
অনেকেরই ধারণা দাঁতের চিকিৎসা বেশ খরচসাপেক্ষ। চিকিৎসক অনিরুদ্ধর মতে, “বাইরে থেকে একটা জিনিস শরীরে বসানো হচ্ছে, যা আপনার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে— এর একটু বেশি যত্ন তো নিতেই হবে। এক বার ইমপ্লান্ট করানোর পর সঠিক নিয়ম মেনে যত্ন করলে খুব বেশি খরচ হয় না। তবে অযত্ন করলেই খরচের মাত্রা বাড়বে।’’
১) দাঁতের ফাঁকে যেন খাবার জমে থাকে না, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কিছু খাওয়ার পর ভাল করে কুলকুচি করতে ভুললে চলবে না।
২) দুপুর আর রাতের খাবারের পর ওয়াটার ফ্লসার ব্যবহার করুন।
৩) বেশি ব্রিস্ল যুক্ত আলট্রা সফ্ট ব্রাশ ব্যবহার করুন।
৪) দাঁতের সমস্যা বুঝে পেস্ট এবং মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। সবার দাঁতে সব পেস্ট ও মাউথওয়াশ কাজ করে না। তাই সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পেস্ট আর মাউথওয়াশ বাছুন।
৫) প্রতি বছর এক বার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চেকআপ জরুরি।