নির্দিষ্ট একটা বয়সে যেমন ঋতুচক্র শুরু হয়, তেমনই নির্দিষ্ট সময়ে রজোনিবৃত্তিও আসে। এই রজোনিবৃত্তি বা ‘মেনোপজ়’-এরও কিন্তু তিনটি পর্যায় রয়েছে। ‘পেরিমেনোপজ়’, ‘মেনোপজ়’ এবং ‘পোস্টমেনোপজ়’। পেরিমেনোপোজ় বা ঋতুচক্রের এই শেষ পর্বে মহিলাদের নানা রকম শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মনমেজাজ বিগড়ে থাকে। অল্পেই রেগে যাওয়া কিংবা অবসাদেও ভুগতেও দেখা যায়। সেই সঙ্গেই শরীরের নানা জায়গায় ব্যথাবেদনা ভোগায়। ইদানীংকালে ফ্রোজ়েন শোল্ডারের সমস্যা মহিলাদের বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রজোনিবৃত্তি পর্ব এগিয়ে এসেছে বা চলছে, এমন মহিলাদের কাঁধের ব্যথা বেশি ভোগাচ্ছে। কেন এমন ব্যথা হচ্ছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকেরা।
দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ থেকে বিষয়টি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, রজোনিবৃত্তি পর্বে মহিলাদের শরীরে হরমোনের যে ওঠানামা চলে তার জন্য শরীরের ভিতরে প্রদাহ হয়। মূলত ইস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতির কারণে হাড়ের ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। ফ্রোজ়েন শোল্ডারের সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে ‘অ্যাডহেসিভ ক্যাপসুলাইটিস’। এই রোগে আক্রান্ত হলে ঘাড়, কাঁধের পেশি এবং অস্থিসন্ধির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, যে অস্থিসন্ধি দ্বারা বাহু ও কাঁধ সংযুক্ত থাকে, সেই অস্থিসন্ধিতে অবস্থিত হাড়, লিগামেন্ট ও টেনডনগুলি কিছুটা ক্যাপসুলের মতো এক প্রকার কোষ দ্বারা আবৃত থাকে। এই ক্যাপসুলের ক্ষয় হলে বা শক্ত হয়ে গেলে তখন কাঁধের বেশি আড়ষ্ট হতে থাকে। হাত ও কাঁধ নাড়াচাড়া করা যায় না। মহিলাদের ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমাণ কমতে থাকলে এ সমস্যা বেশি হয়।
আরও পড়ুন:
হরমোনের পরিবর্তনের ফলে শরীরে কোলাজেন প্রোটিনেরও ঘাটতি হতে থাকে। এর ফলে বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ হতে থাকে। ফলে কাঁধ, হাঁটু ও পায়ের ব্যথা বেড়ে যায়। ফ্রোজ়েন শোল্ডার শুধু নয়, মহিলাদের অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের রজোনিবৃত্তির কারণে ফ্রোজ়েন শোল্ডার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তা ছাড়া যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে ডায়াবিটিস, থাইরয়েডে ভুগছেন, তাঁদেরও এমন সমস্যা হতে পারে। প্রথমে হালকা ব্যথা দিয়ে শুরু হয়। ধীরে ধীরে কাঁধ শক্ত হতে থাকে। হাত ওঠানো ও নামানোর সময়েও যন্ত্রণা হয়। ঘুমের সময়ে কাঁধে চাপ পড়ে ব্যথা আরও বাড়ে।
সমাধানের উপায় কী?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ আর্থ্রাইটিস অ্যান্ড মাস্কিউলোস্কেলেটাল স্কিন ডিজ়িজ়-এর তথ্য বলছে পঞ্চাশের পরে মহিলাদের দিনে ১২০০ মিলিগ্রামের মতো ক্যালশিয়াম খেতেই হবে। কেবল সাপ্লিমেন্ট থেকে নয় খাওয়াদাওয়া থেকেও তা শরীরে ঢোকা জরুরি। তবেই হাড়ের জোর বাড়বে।
দুগ্ধজাত খাবারে ভাল মাত্রায় ভিটামিন ডি থাকে। তাই হাড় মজবুত করতে ও শরীরকে চাঙ্গা করতে রোজের ডায়েটে দুধ, দই, ছানা, চিজ় এগুলি রাখা যেতেই পারে।
ব্যথা জায়গায় মেন্থল ও কর্পূর এক সঙ্গে মিশিয়ে লাগালে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে। ঘাড়ের পেশি শিথিল হয়ে ঠান্ডা অনুভূতি হবে। আরাম পাবেন।
ব্যথা কমাতে ল্যাভেন্ডার অয়েলের ব্যবহার বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে। ল্যাভেন্ডার অয়েল কিনে বাড়িতে রাখুন। ঘাড়ে ও কাঁধে ব্যথা হলে ল্যাভেন্ডার অয়েল লাগান। আরাম পাবেন।
নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামেও ব্যথা কমবে। করতে পারেন শোল্ডার রোল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই কাঁধ কানের কাছে তুলুন। তার পর ঘুরিয়ে পিছনের দিকে নামিয়ে নিন। এই ভাবে ঘড়ির কাঁটার দিকে ও বিপরীত দিকে ১০ বার করে করুন। ওয়াল পুশ-আপও করা যায়। দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুই হাত দেওয়ালের উপর রাখুন। এ বার সাধারণ পুশ-আপের মতো দেওয়ালের দিকে শরীরের সামনের অংশ এগিয়ে নিন ও পিছিয়ে আনুন। এটি কাঁধের পেশি মজবুত করবে।