ভাল থাকাটা চিরকালই খুব ব্যক্তিগত বিষয়। সারা দিন কাজের ক্লান্তিতে আপনাআপনি ঘুম নেমে আসত চোখে। কোনও ওষুধ, নরম আলো বা ‘স্লিপ রুটিন’ তৈরি করে ঘুমকে ডাকার দরকার পড়ত না। যা সহ্য হত না, সেটাকে এড়িয়ে গিয়ে বাড়ির তৈরি খাবার খেলেই শরীরও সুস্থ থাকত। মন খারাপ হলে গান শুনলে, আড্ডা দিলে বা বাইরে থেকে হেঁটে এলেই হালকা লাগত অনেক। দৈনন্দিন রুটিনে দমবন্ধ হয়ে এলে দাওয়াই ছিল বেড়িয়ে আসা।
পৃথিবীটা দৌড়তে শুরু করতেই যত বিপত্তি। নানা উপকরণের ভিড়ে জীবন জটিল হল আর জাঁকিয়ে বসল উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার অভাব। তার মধ্যেই দেখা গেল, ভাল থাকা বা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হয়ে উঠেছে বিরাট এক ট্রেন্ড। চা-কফির বদলে টার্মারিক লাতে (বাদামদুধে হলুদ গোলা), অর্গ্যানিক ফুডের দিকে ঝোঁক ক্রমশ বাড়ছে। এক মাসে পাঁচ কেজি ওজন কমানোর টিপসও সাঙ্ঘাতিক ভিউ পাচ্ছে। তাল মিলিয়ে চার দিকে রমরম করে চলছে ওয়েলনেস ক্যাম্প বা প্রোগ্রামগুলো। যেমন নেচার ক্যাম্প, ওয়েলনেস রিট্রিট, সাত দিনের যোগা কিয়োর কোর্স, স্পা সেন্টার, ডিটক্স সেন্টার ইত্যাদি। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিন বার করে এখানে গেলে নিয়ন্ত্রিত জীবন কাটানোর সুযোগ মেলে। যেমন, ঘুম থেকে উঠে যোগাভ্যাস, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, সূর্যাস্তের সময় ঘাসের উপর হাঁটা, নানা ধরনের শারীরচর্চা... বলা হচ্ছে, এগুলিতে গেলেই নাকি ফিরবে মানসিক সুখ-শান্তি এবং সুস্বাস্থ্য। অনেকেই সন্দিহান— স্বাস্থ্যকর জীবনশৈলী কি সত্যিই এ ভাবে কেনা যায়? নাকি নিছকই বিপণন কৌশল?
সুঅভ্যাস গড়ার অনুশীলন
‘ওয়েলনেস’, সুস্বাস্থ্য বা শরীর-মনের দিক দিয়ে ভাল থাকাটা তো কখনওই ব্যবসায়িক পণ্য নয়, তা একটি সুঅভ্যাস। এ কথায় সায় দিয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবারতি আচার্য বললেন, “মানসিক শান্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, আত্মসম্মান— কোনও দোকানে বা ক্যাম্পে কিনতে পাওয়া যায় না। সম্পর্ক, সুঅভ্যাস, কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি— সাধারণত এগুলিই দীর্ঘমেয়াদি ভাল থাকার ভিত।” কিন্তু জীবন এখন এতই গতিশীল যে সকলে এই বিষয়গুলির মর্ম অনুধাবনই করে ওঠেন না বা হয়তো এগুলিকে প্রাধান্য দেওয়ার অবসর পান না। অর্থাৎ তাঁরা এই সুঅভ্যাসগুলি গড়তে শেখেননি, বা সুযোগ পাননি। সে ক্ষেত্রে কিন্তু ওয়েলনেস ক্যাম্পগুলি এই সুঅভ্যাস গড়ে তোলার রাস্তাটা দেখাতে পারে।
দেবারতি ব্যাখ্যা করলেন, “বিভিন্ন কারণে মধ্যবিত্তদের পরিবারে এ ভাবে রুটিন মেনে জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েট অনুসরণ একটু মুশকিল। বাড়িতে আরাম, খাওয়াদাওয়ার প্রলোভনও বেশি। ফলে, রুটিন শুরু করলেও অনেক সময়ই তা বেশি দিন টেকে না। কিন্তু ওয়েলনেস রিট্রিটগুলিতে ছকে বাঁধা মাপা জীবন অনুসরণ করতে হয়। ছোট্ট ছুটি ভেবে এখানে এসে পৌঁছলে রুটিন ভাঙা, বাইরের খাবার খাওয়ার অবকাশ মেলে না। সকলের সঙ্গে মিলে নতুন ছন্দের অভ্যাস গড়ে ওঠে।” এই সব সেন্টারে জীবন-যুদ্ধে ক্লান্ত আরও বহু সহযোদ্ধাকে পেয়ে যাবেন। আমার জীবনটা ঠিক ভাবে চলছে না, আমি হয়তো নিজের ও পরিবারের ঠিক মতো যত্ন নিতে পারছি না— এই চাপা কষ্টগুলো ভাগ করতে পারবেন, বুঝবেন সমস্যাটা আপনার একার নয়, সকলে মিলে জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিলবে। কিছু না হোক, এই আদানপ্রদানেই ভার লাঘব হবে অনেকটা।
তবে সবচেয়ে জরুরি কথা, এই ধরনের কেন্দ্র বা হিলিং সেন্টারগুলিতে কী ভাবে দিন যাপন হবে, কখন কী খেতে হবে, স্ক্রিনটাইম কমানোর উপায় কী— সেগুলি দেখিয়ে দেওয়ার পর, বাড়িতে ফিরে সেই শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে। তবেই সুফল মিলবে। অতএব, এ রকম সেন্টারে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে, আগে দেখে নিন যে ‘পোস্ট-প্রোগ্রাম গাইডলাইনস’ আছে কি না। অর্থাৎ বাড়ি ফিরে কী ভাবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলি বজায় রাখবেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয় কি না।
ভাল করে যাচাই করুন
এই কেন্দ্রগুলিতে যোগাভ্যাস বা জিম প্রশিক্ষক, পুষ্টিবিদ, শেফ, ওয়েলনেস কোচ প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা থাকেন। অনেক সময় শহর থেকে দূরে পাহাড়ের কোলে রিসর্টের কায়দায় প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ রেখে এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। দক্ষিণা তো থাকবেই। এখন এই ধারাকে ঘিরে একটা বড় শিল্পক্ষেত্র গড়ে উঠেছে। ব্যবসা হচ্ছে মানেই যে গ্রহীতার লাভ নেই, তা নয়। অবশ্যই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে যে, এগুলি কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি নয়। কখনওই শরীর বা মনের অসুখ সারিয়ে দেবে না, রাতারাতি জীবনও পাল্টে দেবে না। খানিক খুশির ছোঁয়া লাগবে। ওয়েলনেস এক্সপার্ট ড. অনন্যা ভৌমিক বললেন, “উপকার অনেক, তবে তা ক্ষণিকের। স্ট্রেস সামলানো যায়, শান্তি ফেরে, সমস্যাগুলোকে চেনা যায়, শরীর সচেতনতা বাড়ে, ডিটক্স হয়, শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া শেখানো হয়। স্ক্রিনটাইম বন্ধ থাকে ফলে মন অনেক ফুরফুরে হয়ে যায়, মনোযোগের ক্ষমতা ও ব্যাপ্তি বাড়ে।”
তাই কোনও প্ল্যান বা স্বাস্থ্য পুনরুজ্জীবন কেন্দ্র অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কি না খেয়াল করুন। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ডিটক্স প্রক্রিয়ায় কিডনি, লিভারের শোধন হয়ে যাবে, এমন দাবি করছে কি না দেখে নিন। পেশাদারদের যোগ্যতা যাচাই করুন এবং রিভিউ পডুন। সতর্ক থাকার পরামর্শগুলি দিয়ে দেবারতি বললেন, “এই সেন্টারগুলি ভাল থাকার একটি উপায়মাত্র, একমাত্র পথ নয়। বিভিন্ন ভাবেই নিজেকে ভাল রাখা সম্ভব।”
আসলে, আপনার শরীর-মনকে আপনার চেয়ে বেশি কেউ চেনে না। তাই, কেউ ম্যাগনেশিয়াম স্প্রে বিক্রি করে আপনার স্ট্রেস কমাতে পারবে না, ব্লু-লাইট চশমা পরিয়ে মনঃসংযোগও বাড়াতে পারবে না। সুষম আহার, পর্যাপ্ত ঘুম, স্ক্রিনটাইম কমিয়ে মানুষের সঙ্গে মেশা, সচল থাকা— এই অভ্যাসগুলোকে জীবনে রপ্ত করে ফেললে বহু সমস্যাই কমে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)