প্রশ্ন মিলে যাবে হুবহু। সেই সব প্রশ্নোত্তর এমন ভাবে অনুশীলন করানো হবে যে, ডাক্তারিতে আসন পেতে সমস্যা হবে না ছাত্র-ছাত্রীদের। পড়ুয়া ধরতে এ ভাবেই নিজেদের সংস্থার প্রচার করত মহারাষ্ট্রের লাতুরের রেণুকাই কেমিস্ট্রি ক্লাসেস (আরসিসি)। তদন্তে ওই কোচিং কেন্দ্রের কর্ণধার শিবরাজ মোতেগাঁওকার তথা ‘এম স্যর’কে গ্রেফতার করার পরেই বিষয়টি জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। এই নিয়ে নিট প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় মোট দশ জনকে গ্রেফতার করল সিবিআই।
তদন্তকারীরা বলছেন, সংস্থার পক্ষ থেকে প্রশ্ন মিলে যাওয়ার যে দাবি করা হয়েছে, তা একেবারে মিথ্যা নয়। এ বছরের সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় (নিট) যে ১৮০টি প্রশ্ন এসেছে, সংস্থার দেওয়া প্রশ্নোত্তরে অন্যান্য প্রশ্নোত্তরের সঙ্গে সেই ১৮০টি প্রশ্নও হুবহু ছিল। সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, ওই কেন্দ্রের প্রধান শিবরাজের সঙ্গে পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা জাতীয় টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) কোনও না কোনও যোগসাজশ ছিল। তদন্তে নেমে গত কাল বিকেলে শিবররাজকে গ্রেফতার করে সিবিআই। তাঁর মোবাইলে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের প্রতিলিপি পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। পরীক্ষার অন্তত দশ দিন আগে অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল শিবরাজের কাছে প্রশ্ন চলে এসেছিল। প্রাথমিক তদন্তে এও জানা গিয়েছে, লাতুরের বাসিন্দা কিন্তু পুণে থেকে গ্রেফতার হওয়া রসায়নের আর এক শিক্ষক পিভি কুলকার্নির সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল শিবরাজের। কুলকার্নি এক সময়ে শিবরাজের কোচিং কেন্দ্রে রসায়ন পড়াতেন। গোয়েন্দারা মনে করছেন, সম্ভবত শিবরাজের কাছ থেকেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পেয়েছিলেন কুলকার্নি। যা তিনি নিজের কোচিং-এর পড়ুয়াদের বিলি করেছিলেন। তার পরে যা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যত্র।
নব্বইয়ের দশকে লাতুরে সাইকেলে করে পড়ুয়াদের বাড়ি বাড়ি পড়াতে যেতেন শিবরাজ। রসায়নের দক্ষ শিক্ষক হিসেবে খুব দ্রুত নাম কেনেন তিনি। প্রথমে দশ জন পড়ুয়া নিয়ে কোচিং কেন্দ্র শুরু করলেও, আজ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জেলায় আরসিসি-র যে কেন্দ্র রয়েছে তাতে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ৪০-৫০ হাজারের কাছাকাছি। তাদের একটি বড় অংশ গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে নিটে ভাল ফল করে এসেছে।
মূলত সর্বভারতীয় পরীক্ষা নেওয়া জন্য ২০১৮ সাল থেকে কাজ করা শুরু করে জাতীয় টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ। কিন্তু তার পর থেকে কেবল নিট নয়, একাধিক বার বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ধারাবাহিক ওই ব্যর্থতা রুখতে এনটিএ-র সংস্কার করা প্রয়োজন বলে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিংহের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা মন্ত্রকের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কেন কমিটির সুপারিশ মানা হয়নি, এ বছর প্রশ্ন ফাঁসের পরে তা জানতে চাওয়া হলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছিলেন, ‘‘সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য রয়েছেন। আপনারা জানেন, তাঁরা কী ভাবে বিষয়গুলিকে তুলে ধরেন। তাই আমি সংসদীয় কমিটির বিষয়ে কোনও মন্তব্য করব না।’’
বিরোধীদের মতে, সংসদীয় কমিটির কাজ হল সরকারের খামতিগুলি চিহ্নিত করা। যে হেতু বিরোধীরা কমিটিতে রয়েছেন, তাই সেই সুপারিশ অর্থহীন— এমন ভাবনাচিন্তা হলে যে কারণে কমিটিগুলি গড়া হয়েছে তার উদ্দেশ্য নষ্ট হয় বলেই মনে করছেন রাজনীতিকেরা। সংসদীয় কমিটি নিয়ে ওই ধরনের মন্তব্য করে আসলে সংসদের গরিমা নষ্ট করেছেন ধর্মেন্দ্র, এই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যসভায় আজ স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ। পাশাপাশি নিট-সহ অন্যান্য সর্বভারতীয় পরীক্ষায় কেন প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, তা নিয়ে জানতে দিগ্বিজয় সিংহ আগামী ২১ মে-র বৈঠকে এনটিএ চেয়ারপার্সন প্রদীপ কুমার জোশী এবং উচ্চশিক্ষা সচিব বিনীত জোশীকে তলব করেছেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)