স্টেশনের মাইকে ঘোষিকার কণ্ঠে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, তিন ভাষার ঘোষণা কানে আসছে। স্টেশনের বাইরে, ভাষা শহিদ স্মারকের সামনে ফলকে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে লেখা ১৯৬১ সালের ১৯ মে পুলিশের গুলিতে নিহতদের তালিকা। কমল, কানাই, বীরেন্দ্র, সতীন্দ্র, হেমেন্দ্র, সুকোমল, হিতেশ, কুমুদ, সুধীর, চণ্ডীচরণ আর কমলা। ওই স্মারকই বুঝিয়ে দেয়, অসমের এই স্টেশনে কেন অসমিয়া ভাষার ঘোষণা ব্রাত্য। আবার ওই স্মারকের ইতিহাসেই লুকিয়ে রয়েছে বরাক উপত্যকার ধারাবাহিক বঞ্চনার দলিল। যে বঞ্চনার জেরে ভাষা শহিদদের উপরে নির্বিচারে পুলিশের গুলি চলেছিল এই স্টেশনেই। কিন্তু তার নাম ‘ভাষা শহিদ স্টেশন’ করা হলনা আজও।
শিলচরে সরকার হোক বা সরকার-বিরোধী, দুই শিবিরে অমোঘ সেতুবন্ধন ভাষার। তাই শিলচরের কংগ্রেস নেত্রী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রসঙ্গে রাজ্য কমিটির বিরোধিতায় পিছপা হন না। বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে জেলা বিজেপির নেতা কঠোর সমালোচনা করেন রাজ্য নেতৃত্বের।
এ বারের অসম নির্বাচনকে বিজেপি ‘অসমিয়ার অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম’ বলে দাগিয়ে দিয়ে লড়তে নেমেছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া বা ভূমিপুত্রের অস্তিত্বরক্ষার যে সংজ্ঞা, বরাক নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই সংজ্ঞা যায় বদলে। ওখানেযে সংখ্যালঘু ধর্মের ভিত্তিতে অবাঞ্ছিতের লাইনে দাঁড়ান, এখানে সেটাই ভাষিক সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে অবহেলার রোজনামচা।
বিশাল বঙ্গভবনে, বরাক বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সভাকক্ষে বসে ব্রহ্মপুত্রের বাঙালি হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন। মনে হতে পারে, বরাকে তো বাঙালিরই রাজত্ব। তাঁদেরই মুলুক। কিন্তু সংস্থার কাছাড় জেলার সভাপতি সঞ্জীব দেব লস্কর বলেন, বাঙালিপ্রধান হওয়ার জন্যই বরাকবাসী বছরের পর বছর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতোই বঞ্চিত। এখানে সরকারি সুবিধে মেলেসকলের শেষে। বহু আবেদন-আন্দোলনেও পূরণ হয় না বাঙালিদের দাবি। এত বছরের আন্দোলনের পরেও শিলচর স্টেশন হয়নি ভাষা শহিদের নামাঙ্কিত। কিন্তু ভোটের আগে উথলে ওঠা দরদে তড়িঘড়ি সড়ক প্রকল্পের শিলান্যাস হয়, মিনি সচিবালয়ের কাজে জোর বাড়ে, নেতা-মন্ত্রীদের যাতায়াতে মনে হয় একেবারেদুয়ারে উন্নয়ন।
কিন্তু লস্করের মতে, ‘‘আমাদের অস্তিত্বের সঙ্কট চিরকালীন। এখানকার বাঙালিদের হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। সবাই মোটেই বাংলাদেশ থেকে আসা নয়। কিন্তু অসমিয়া বা জনজাতি পদবীধারীদের পাশাপাশি আমরাও যে এ রাজ্যের আদি অধিবাসী— তা আমরা দিসপুরকে বোঝাতে পারছি না।’’
অসমে চাকরির ক্ষেত্রে অসমিয়া, বড়ো বা বাংলার ডিপ্লোমা বাধ্যতামূলক। সে ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার বরাক বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনকে বাংলায় ডিপ্লোমা প্রদানের ভার দিয়েছে। সেই শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বে থাকা গৌতমপ্রসাদ দত্ত বলেন, ‘‘মজার কথা, অনেক অসমিয়া ছাত্র দূরশিক্ষার মাধ্যমে এখান থেকে বাংলার ক্লাস করে, ডিপ্লোমা নিয়ে সরকারি চাকরি পাচ্ছেন। কিন্তু ১ লক্ষ ৬০ হাজার যুবককে চাকরি দেওয়ার দাবি করা সরকার বরাকের ক্ষেত্রে অন্ধ। এখানে হাজারে ১ জন সরকারি চাকরি পাচ্ছেন।’’
বসুন্ধরা প্রকল্পে জমির পাট্টা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বরাকে একই ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ। বরাকবাসীর অভিযোগ, অসম চুক্তির ছয় নম্বর দফা রূপায়ণের জন্য তৈরি বিপ্লব শর্মা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তিন পুরুষের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ না দিতে পারলে না মিলছে চাকরি, না মিলছে সরকারি সুবিধে।
সঞ্জীব দেব লস্করের ক্ষোভ, “মূল ভূখণ্ডে উত্তর-পূর্বের মানুষকে চিঙ্কি বলা অপমানজনক। তেমনই অসমেও ভাষিক সংখ্যালঘুমাত্রকেই যে ভাবে বাংলাদেশি, বহিরাগত, বিদেশি শব্দবন্ধে চিহ্নিত করা শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধেও সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ ও আইন প্রয়োজন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)