E-Paper

সমাজমাধ্যমে মত প্রকাশে রাশ বাড়ানোর প্রস্তাব কেন্দ্রের

ওয়াকিবহাল মহলের অবশ্য অভিযোগ, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলি সুদূরপ্রসারী অভিঘাত বয়ে আনতে পারে এবং সমাজমাধ্যমে জনমত নির্মাণ এবং ব্যক্তিগত মত প্রকাশের পরিসর ব্যাপক ভাবে খর্ব করতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৫
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

সমাজমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপরে আরও কড়া লাগাম পরাতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। বৈদ্যুতিন এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের তরফে চলতি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে বদল এনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রককে সমাজমাধ্যমে আরও কড়া নজরদারি এবং সেন্সরশিপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ১৪ এপ্রিলের মধ্যে এর পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত জানানো যাবে। তার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে বলে সোমবার জানানো হয়েছে।

কী ধরনের কড়াকড়ির কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে? সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলায় বিচ্যুতি হলেই সমাজমাধ্যমের যে কোনও মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্মকে সরিয়ে দেওয়া বা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রককে দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে। কনটেন্ট নির্মাতা এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের গেরো আরও কঠোর হতে চলেছে। সরকারি নির্দেশ-উপদেশ-বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নেটিজ়েনদের বাধ্যবাধকতা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সেই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বাইরে নেটিজ়েনদের তরফে খবরাখবর প্রকাশ করা এবং ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরও কড়া হচ্ছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকাশক অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম নিজে ছাড়া অন্য কেউ যদি কোনও খবর প্রকাশ বা পোস্ট করতে চান, তাঁকে বিধিনিষেধ মেনেই তা করতে হবে। সরকারের তরফে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০২১-এর এই সংশোধনী প্রস্তাবকে স্রেফ ‘ব্যাখ্যামূলক এবং পদ্ধতিগত’ পরিবর্তন বলে দাবি করা হয়েছে।

ওয়াকিবহাল মহলের অবশ্য অভিযোগ, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলি সুদূরপ্রসারী অভিঘাত বয়ে আনতে পারে এবং সমাজমাধ্যমে জনমত নির্মাণ এবং ব্যক্তিগত মত প্রকাশের পরিসর ব্যাপক ভাবে খর্ব করতে পারে। এবং বলা বাহুল্য, বিরোধী কণ্ঠস্বরই তাতে ক্ষীণ হওয়ার সুযোগ বেশি। যেমন প্রস্তাবে চলতি আইনের তিন নম্বর ধারায় একটি চার নম্বর উপধারা যোগ করে বলা হয়েছে, সরকারি আদেশ-নির্দেশ-পরামর্শ-কার্যবিধি-উপদেশ-রীতিনীতি সব কিছু অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সমাজমাধ্যমের সব প্ল্যাটফর্ম বা ইন্টারমিডিয়ারি-দের। ডিজিটাল পরিসরে ইন্টারমিডিয়ারি বা মধ্যস্থ বলা হয় সেই সব প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চকে, যারা নেটিজ়েনদের সেই মঞ্চ ব্যবহার করে আত্ম-প্রকাশের সুযোগ দেয়। যেমন ফেসবুক, যেমনইউটিউব, যেমন এক্স, যেমন ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি। দর্শক-পাঠক-জনতা আর নেটিজ়েনের মাঝখানে থেকে এরা সেতুবন্ধনের কাজটি করে। নতুন প্রস্তাবে মঞ্চের সুরক্ষার সঙ্গে সরকারি নির্দেশ মেনে চলার প্রতিশ্রুতিকে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনও মঞ্চে যদি সরকারি বিধিনির্দেশের পরিপন্থী কোনও বক্তব্য বা খবর প্রকাশিত হয়, পুরো মঞ্চের নিরাপত্তাই তাতে বিঘ্নিত হতে পারে। যে কোনওমঞ্চকে বিধিভঙ্গের কারণে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও একই সঙ্গে রাখা হয়েছে।

ভারতের আইনি বিধিনিষেধ মেনে চলার দায় আগেও সমাজমাধ্যমের ছিল। কিন্তু সেটা সরাসরি কোনও ডিজিটাল মঞ্চের সার্বিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। ফলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে যে, এই প্রস্তাব কার্যকরী হলে মঞ্চগুলি নিজেদের মসৃণ গতি বজায় রাখার স্বার্থেই কোনও রকম ঝুঁকিপূর্ণ বক্তব্য বা খবর আর প্রকাশ করতে দেবে না। অন্য দিকে, ইউজ়ার বা গ্রাহকদের উপরেও রাশ দৃঢ় হচ্ছে নতুন প্রস্তাবে। কারণ কনটেন্ট নির্মাতা বা ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে সাধারণ ইউজ়ার— প্রত্যেকের জন্যই বিধিনিষেধ কড়া হচ্ছে। যেমন চলতি আইনের ৮ নম্বর ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব বলছে— সংবাদভিত্তিক পোস্টের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ প্রকাশকদের জন্য যে সব নিয়মবিধি ছিল, সেগুলি এখন থেকে নথিভুক্ত প্রকাশক নন যাঁরা, অর্থাৎসাধারণ ইউজ়ারদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। নথিভুক্ত সংবাদমাধ্যমের আওতার বাইরে নির্মিত সংবাদভিত্তিক কোনও পোস্ট প্রকাশ করা, সম্প্রচার করা, আপলোড করা, শেয়ার করা, সঞ্চালনা করার জন্যও সাধারণ গ্রাহক-কনটেন্ট নির্মাতা-ইনফ্লুয়েন্সারকে সরাসরি জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। এমন কোনও ‘আপত্তিকর’ পোস্ট যদি কোনও সমাজমাধ্যম সরকারি নির্দেশের জেরে সরিয়েও নেয়, তারা কিন্তু তৎক্ষণাৎ সেই কারণ দেখিয়ে ওই ইউজ়ার বা গ্রাহকের এমন কোনও ডেটা মুছে ফেলতে পারবে না যা অন্য কোনও আইনের অধীনে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে এক দিকে ভুয়ো খবরের রমরমা হয়তো কমতে পারে। কিন্তু তার পাশাপাশি ‘স্বাধীন’ সংবাদ এবং নাগরিক-সাংবাদিকের ‘স্বাধীন’ পরিসরও সংকুচিত হবে অনেকখানি। অলাভজনক সংস্থা ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই নয়া প্রস্তাবকে ‘অসাংবিধানিক সেন্সরশিপ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের যে রায় সাবেকি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ক ধারাকে বাতিল করেছিল, এই প্রস্তাব তার পরিপন্থী।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Central Government Social Media

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy