E-Paper

পুরো ‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে আপত্তি উত্তর-পূর্বে

এর আগে গোমাংসের বিরুদ্ধে প্রচার করতে গিয়েও মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজ়োরাম, অরুণাচল প্রদেশে প্রতিবাদের মুখে পড়েছে বিজেপি ও আরএসএস।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪২
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

মিজ়োরামের ছোট্ট মেয়ে এস্থার নামতের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’ শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সে ছিল গানটির আগের সংক্ষিপ্ত রূপ। এ বারে স্কুল থেকে সরকারি অনুষ্ঠান, দেশে সর্বত্র ‘বন্দে মাতরম্’ পুরো গানটি গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র। তাতেই আপত্তি উত্তর-পূর্বের অধিকাংশের। আপত্তির কারণ, ‘তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম/তুমি হৃদি তুমি মর্ম’, অথবা ‘তোমার প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে’-এর মতো অংশগুলি। বলা হচ্ছে, একে তো সেখানে বেশ কিছু লাইন রয়েছে বাংলায়। তার উপরে সেই সব লাইনে মন্দির গড়া, দেবী বন্দনার উপস্থিতিতে বিরক্ত জনজাতি এবং খ্রিস্টানপ্রধান রাজ্যগুলি। ফলে অস্বস্তিতে বিজেপি।

এর আগে গোমাংসের বিরুদ্ধে প্রচার করতে গিয়েও মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজ়োরাম, অরুণাচল প্রদেশে প্রতিবাদের মুখে পড়েছে বিজেপি ও আরএসএস। এ বারে উত্তর-পূর্বে দাবি উঠেছে, সংবিধানকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম্’ সংক্রান্ত নয়া নির্দেশিকার বিরুদ্ধে লড়াই করা হোক।

নাগা ছাত্র সংগঠন এই নির্দেশিকার তীব্র বিরোধিতা করে বলে, ভিন্ন ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতির গান সকলকে গাইতে বাধ্য করা কেন্দ্রের ‘আরোপিত সিদ্ধান্ত’। নাগা ভূখণ্ডে ‘সাংস্কৃতিক ঐক্যের’ নামে কেন্দ্র এ ভাবে কোনও কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। রাজ্যের স্কুলগুলিতে ‘বন্দে মাতরম্’ বাধ্যতামূলক ভাবে গাওয়ার নিয়ম চালু করা চলবে না। নাগাল্যান্ড বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের সূচনায় রাজ্যপালের বক্তৃতার পরে প্রথম বার ওই ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের পরেই ব্যাপক বিতর্ক হয়। দল নির্বিশেষে বিধায়কেরা দাবি করেন, নাগাল্যান্ডের মতো খ্রিস্টান অধ্যুষিত রাজ্যে এমন গান বাধ্যতামূলক করা সাংবিধানিক ও ধর্মীয় জটিলতার জন্ম দিচ্ছে। বিধায়কেরা ১৯৮৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায় উদ্ধৃত করে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে জোর করে গাওয়ানো হলে তা সংবিধানে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী হতে পারে। বিধায়কদের মত, নাগাল্যান্ডবাসী এত দিন ধরে ‘জনগনমণ’ গেয়ে তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছেন। তাই রাজ্য নয়া নির্দেশিকার ক্ষেত্রে আপত্তি তুলুক। মুখ্যমন্ত্রী নেফিয়ু রিও ‘বন্দে মাতরম্’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করেও বলেন, ভারতের শক্তি তার বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধে নিহিত। তীব্র বিতর্কের পরে বিষয়টি বিধানসভার সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। নাগাল্যান্ড যৌথ খ্রিস্টান ফোরামের দাবি, গানটির কিছু অংশ খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের সরাসরি বিরোধী। জাতীয় ঐক্যের জন্য ‘জনগণমন’ই যথেষ্ট।ব্যাপটিস্ট চার্চ কাউন্সিলের বক্তব্য, এই নির্দেশ ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতির বিরোধী। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের খ্রিস্টান বিদ্যালয়গুলির উপরে অনেক সময়েই নানা রকম ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। অথচ নাগা ভূখণ্ডের সব স্কুলে বন্দে মাতরম্‌ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

মিজ়োরামে ইয়ং মিজ়ো অ্যাসোসিয়েশনের এক নেত্রী বলেন, “জনগণমন বা বন্দে মাতরম্ ভারতের পরিচয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বন্দে মাতরম্-এর কেন্দ্র-নির্দেশিত অংশ অতিরিক্ত দীর্ঘ। সেখানে সরাসরি হিন্দু ধর্মের দেবীকে প্রার্থনা ও মন্দির গড়ার কথাও রয়েছে। এ ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে হিন্দু ধর্মের গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করা প্রকৃত দেশপ্রেম হতে পারে না।” মেঘালয়ের এক বিজেপি নেতাও মনে করছেন, এ ভাবে অপরিচিত সংস্কৃতি পালনে জনজাতি ও খ্রিস্টানদের বাধ্য করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

বিজেপি যদিও দাবি করেছে, গানে হিন্দু ধর্ম পালনের কথা লেখা নেই। আছে ভারতমাতার বন্দনা, যা কংগ্রেস নেতৃত্ব বাদ দিতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অসমে কংগ্রেস নেতারা বলছেন, বিজেপি ইচ্ছে করেই ইতিহাস বিকৃত করছে। তারা গায়ের জোরে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ও বৈচিত্রের সৌন্দর্য নষ্ট করতে চাইছে।

অসম তৃণমূলের মুখপাত্র অভিজিৎ মজুমদার বলেন, “এই নির্দেশ দেওয়ার আগে উত্তর-পূর্বে ভাষা ও সম্প্রদায়গত টানাপড়েনের কথা মাথায় রাখা উচিত ছিল।” অসম খ্রিস্টান সমাজের এক নেতা বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী, বৈষম্য ছাড়াই ব্যক্তিগত ভাবে ধর্ম পালন, আচরণ এবং প্রচার করার স্বাধীনতা আমাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু অসমে বলা হচ্ছে, খ্রিস্টানেরা জোর করে ধর্মান্তরিত করছেন। এ দিকে, বন্দে মাতরম্-এর নয়া নির্দেশিকায় কেন্দ্র নিজেই সংবিধানের উল্টো কাজ করল।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

North East India Vande Mataram

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy