Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

‘ভারতে ভুয়ো খবর ছড়াতে বেশি তৎপর হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলিই’

ভুয়ো খবর, উন্মত্ত জনতা, গণপিটুনি। একই চিত্রনাট্যে বদলে যাচ্ছে স্থান, কাল। লিখছেন অরুণাভ পাত্র।

অরুণাভ পাত্র
০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৫:৪২
Save
Something isn't right! Please refresh.
অলঙ্করণ: শৌভিক দেবনাথ।

অলঙ্করণ: শৌভিক দেবনাথ।

Popup Close

আরও একটা গুজব। আবার উন্মত্ত জনতা। ফের বল্গাহীন হিংসা এবং মৃত্যু। বাড়তে থাকা সেই তালিকায় শেষতম সংযোজন সুবোধকুমার সিংহ। উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে গোহত্যার গুজবে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে মারল কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে।

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫। সে দিন এই তালিকায় ঢুকেছিল মহম্মদ আখলাকের নাম। উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে সে দিনও গুজব রটেছিল, তাঁর বাড়িতে গরুর মাংস রয়েছে। সেদিনও উত্তেজিত হয়েছিল জনতা। পিটিয়ে মারা হয়েছিল ৫২ বছরের মহম্মদ আখলাককে।

৩০ মে, ২০১৫। রাজস্থানের জয়পুর থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে বীরলোকা গ্রামের ভাগাড়ে পাওয়া গিয়েছিল ২০০টি গরুর মৃতদেহ। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল গুজব। গোহত্যায় মেতেছেন স্থানীয় মাংস বিক্রেতা আব্দুল গফফর কুরেশি, এই অভিযোগে তাঁকে পিটিয়ে মারে উত্তেজিত জনতা। পরে জানা যায়, স্থানীয় এক ঠিকাদার পুরসভার অনুমতি নিয়েই এই মৃত গরুগুলি ভাগাড়ে ফেলেছিলেন। এর সঙ্গে কুরেশির কোনও যোগ ছিল না।

ভুয়ো খবর, গুজব, উন্মত্ত জনতা এবং গণপিটুনি। একই চিত্রনাট্য, শুধু বদলে যাচ্ছে স্থান, কাল এবং পাত্র। আর এই রঙ্গমঞ্চ শুধু বুলন্দশহর, দাদরি বা জয়পুর নয়। মারণ ভাইরাসের মতো তা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতে। অসম থেকে কর্নাটক, ত্রিপুরা থেকে গুজরাত। ছবিটা প্রায় এক সব জায়গাতেই।

Advertisement



প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘কমন ফ্যাক্টর’ একটিই। গুজব এবং সোশ্যাল মিডিয়া। কখনও ফেসবুক, কখনও হোয়াটসঅ্যাপ, কখনও টুইটার। হিসেব বলছে, শেষ এক বছরে সারা ভারতে ভুয়ো খবর বা ‘ফেক নিউজ’ সংক্রান্ত ঘটনার জেরে ৩৩টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এবং সেই সংখ্যা আরও বাড়ছে।

কিন্তু ভুয়ো খবর ছড়ানোর এই সব ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন? তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত উত্তেজনাই কি এর এক মাত্র কারণ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? সমস্যা কি শুধুই আধুনিক প্রযুক্তির কারণে?

আরও পড়ুন: গো-রক্ষার নামে হিংসা ৪১৫০% বাড়ল এই জমানায়!

অতীতে ঢুঁ মারলে অবশ্য দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের ঘটনা আদৌ নতুন নয়। সাধারণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যখন ভিন্ন মতের মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না, যখন রাজনৈতিক উপায়ে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার যুক্তি বা ধৈর্য্য থাকে না, তখনই বেছে নেওয়া হয় অপেক্ষাকৃত সহজ রাস্তা। ভুয়ো খবর ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে খতম করা, ভিন্ন মতকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার এই পন্থাকেই হাতিয়ার করে সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী অংশ। যা ভাল বুঝতে পারা যায় হিটলারের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ভুয়ো খবর নিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক হিংসাও আসলে সেই ধারারই অংশ। সেই ইঙ্গিতই মিলল বিবিসি প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে।

আরও পড়ুন: মোদীর রাজ্যে ফের আক্রান্ত হিন্দিভাষীরা, লুঙ্গি পরার ‘অপরাধে’ই কি মার?

দীর্ঘদিন সমীক্ষা চালানোর পর এই রিপোর্ট সামনে এনেছে এই ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা। সেখানে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরেই ভারতে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবোধ। ভুয়ো খবর ছড়ানোর পিছনে এই উগ্র জাতীয়তাবোধই নিচ্ছে সব থেকে প্রভাবশালী ভূমিকা। আর এই বোধ ছড়ানোর জন্য সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী হিন্দু সংগঠন ও তাদের নেটওয়ার্ক। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন মতাদর্শের বিভিন্ন গোষ্ঠী ভুয়ো খবর ছড়াতে তৎপর হলেও সংখ্যার হিসেবে বাকিদের বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে বেশ কিছু ‘হিন্দুত্ববাদী’ নেটওয়ার্ক। ভুয়ো খবর ছড়াতে এইসব নেটওয়ার্ক বাকিদের অনেক বেশি সংগঠিত বলেই দাবি করা হয়েছে বিবিসি-র এই রিপোর্টে।



কী ধরনের ভুয়ো খবর ছড়ায় বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী হিন্দু নেটওয়ার্ক? সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের দ্বারা প্রচারিত ভুয়ো মেসেজগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মূলত চারটি বিষয়কে হাতিয়ার করে ছড়ানো হচ্ছে ফেক নিউজ। সেগুলি হল অপরাজেয় হিন্দু শক্তি, ভারতের গৌরবময় ঐতিহ্য ও তার পুনরুদ্ধার, মোদীর ব্যক্তিত্ব ও ক্ষমতা, প্রগতি ও জাতীয় গর্ব। অর্থাৎ পরম্পরা মেনেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী। আসলে নতুন মোড়কে ছড়ানো হচ্ছে পুরনো বক্তব্যই।

ইন্টারনেট আসার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এই প্রোপাগান্ডা? তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে বিবিসি-র এই গবেষণায়। এই জন্য ১৬,০০০ টুইটার অ্যাকাউন্ট, ৩২০০ ফেসবুক পেজ এবং ৪৭, ৫৪৩টি ফেক নিউজ সংক্রান্ত প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করেছে তারা।

বিবিসির রিপোর্টে স্পষ্ট ভাবেই বলা হয়েছে, অধিকাংশ ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবরের পেছনেই আছে রাজনৈতিক অভিসন্ধি। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রাথমিক নিশানা সোশ্যাল মিডিয়াই। প্রথমে বানানো হয় ভুয়ো খবরের মেসেজ। ভিডিয়োর থেকে ছবি ব্যবহারেই সাফল্য আসে বেশি। সেই ছবি সহ মেসেজটি বানানোর পর আসরে নামে অ্যামপ্লিফায়ার প্রোফাইল। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় যে অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে এই ভুয়ো খবর বা ফেক নিউজ, তাকেই বলা হয় অ্যামপ্লিফায়ার প্রোফাইল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অ্যাকাউন্ট হয় ভুয়ো। সেই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম মতাদর্শী বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করা হয় এই মেসেজ। এ ভাবেই ধীরে ধীরে ভাইরাল হয়ে ওঠে ভুয়ো মেসেজ। ভাইরাল হওয়ার পর কখনও তা এতটাই ‘সত্যি’ হয়ে ওঠে, যে মূল ধারার প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমও হয়ে পড়ে এই ভুয়ো খবরের শিকার। সে ক্ষেত্রে আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে এই ভুয়ো খবর। একদম শেষ পর্যায়ে সাধারণ মানুষও এই খবর বিশ্বাস করে তা ছড়াতে শুরু করেন। এভাবেই মিথ্যা হয়ে ওঠে সত্যি।



আধুনিক দুনিয়ায় ফেক নিউজ যে একটা বাস্তবতা, তা প্রথম বোঝা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ফেসবুকের। তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পিছনে রাশিয়ার মদত ছিল। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামের সংস্থা ব্যবহার করেছিল মার্কিন নাগরিকদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ডেটাবেস। সারা দুনিয়া এখন জেনে গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই প্রভাবিত করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রশ্নের মুখে পড়েছিল মার্কিন গণতন্ত্র।

কিন্তু ভারতে এসে অন্য বাঁক নিয়েছে ভুয়ো খবর। কখনও ছেলেধরা, কখনও গরু চুরি, কখনও কিডনি চুরি, কখনও গরু পাচার। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো খবর ছড়ানোর মাধ্যমে যে লাগাম ছাড়া হিংসার দরজা খুলে গিয়েছে ভারতে, তা সারা দুনিয়ায় বেনজির। আমাদের দেশের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের কারণ, এই মুহূর্তে সারা ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়া দাপটও। গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া। সারা পৃথিবীতে হোয়াটসঅ্যাপের বৃহত্তম বাজার এখন ভারত। ভুয়ো খবর ছড়াতে হোয়াটসঅ্যাপকে সব থেকে বেশি ব্যবহার করা হলেও পিছিয়ে নেই ফেসবুক, টুইটারের মতো অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াও। কখনও কখনও মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলিও হয়ে পড়ছে ফেক নিউজের শিকার।



ভুয়ো খবরের মাধ্যমে হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া হয় এই ধরণের মেসেজের মাধ্যমেই।

প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায়েরও মত, ‘‘ভুয়ো খবর ছড়াতে দক্ষিণপন্থী শক্তির তৎপরতা বরাবরের। জোয়ান অব আর্ককে মিথ্যা অভিযোগে পুড়িয়ে মারা থেকে শুরু করে হিটলারের জমানায় গোয়েবলস-এর মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, সর্বত্রই ভুয়ো খবর ছড়ানোকে কার্যসিদ্ধি হাসিল করার অন্যতম রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ডিজিটাল জমানায় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছে। ভারতেও এখনও পর্যন্ত যে কারণে বেশি তৎপরতা দেখাচ্ছে ‘হিন্দুত্ববাদী’রাই। ছত্তীসগঢ়ের মাওবাদীদের বিরুদ্ধে ভুয়ো খবর ছড়ানোর কোনও অভিযোগ তো এখনও ওঠে নি। ’’

একই সঙ্গে তিনি জানান, ‘‘ইন্টারনেট আসার পর কোনও ব্যক্তি খুব সহজে খবর তৈরি করতে পারেন। সেই খবর খুব সহজে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশও করতে পারেন। ইন্টারনেট ডেটা সস্তা হওয়ার কারণে কোনও মেসেজ ফরওয়ার্ড করতে বিশেষ কিছু খরচও হয় না। সেই হিসেবে দেখতে গেলে উদ্দেশ্য এক থাকলেও এখন কার্যসিদ্ধি করা সম্ভব আরও সহজে। আগের থেকে ফারাক এখন এটাই।’’



সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ফর উইমেনস-এর অধ্যাপিকা রিয়াঙ্কা রায়ের গবেষণার বিষয় সোশ্যাল মিডিয়া। তাঁর মত, ‘শুধু ভারত নয়, এই সমস্যা সারা পৃথিবীর। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ প্রভাব এবং কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কী ভাবে ফেসবুকের তথ্য ব্যবহার করেছে, সেই তথ্য সামনে আসার পর এই নিয়ে আর কোনও লুকোছাপা নেই।’’

আরও পড়ুন: দায়িত্ব জ়াকারবার্গেরই

সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রোপাগান্ডা হাসিল করার অন্যতম অস্ত্র হিসেবে সারা পৃথিবীতে ব্যবহার করা হলেও এ দেশে ভুয়ো খবরের কারণে যে ভয়াবহ হিংসা জন্ম নিচ্ছে তা এক কথায় নজিরবিহীন। লোকসভা নির্বাচনের আগে ক্রমশ বেড়ে চলেছে এই হিংসা। মনে রাখতে হবে, লোকসভা ভোট আর হোয়াটসঅ্যাপ, এই যুগলবন্দি ভারতে প্রথম বারের জন্য আত্মপ্রকাশ করছে ২০১৯-এই। ইতিমধ্যেই সেই যুদ্ধের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। অসংখ্য প্রোফাইল, অ্যাকাউন্ট আর ফলোয়ারের মাধ্যমে সেই ক্ষেত্রের দখল নিতে মরিয়া সব পক্ষই। রাজনৈতিক কারণেই তাই আগামী দিনে আরও বেশি ভুয়ো খবর ছড়ানোর আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

(কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাত থেকে মণিপুর - দেশের সব রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে আমাদের দেশ বিভাগে ক্লিক করুন।)



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement