অর্থাভাবে মাঝপথে বন্ধ হয়েছিল পড়াশোনা। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি মেধাবী ওই তরুণ। হাল ছাড়েননি। সেই স্বপ্ন ছড়াতে চেয়েছিলেন তারই মতো পরিস্থিতিতে থাকা পড়ুয়াদের মধ্যে। তাই ফুটপাথে খাবারের দোকান চালানোর ফাঁকের সময়টুকু তিনি দিয়েছেন গরিব পরিবারের কচিকাঁচাদের। তাদের পড়াচ্ছেন, স্বল্প আয়ের কিছুটা বাঁচিয়ে কিনে দিচ্ছেন বই, খাতা, পেন্সিলও!
গল্প নয়। ঝরিয়ার বছর কুড়ির বাঙালি তরুণ ঋষিকুমার সেনের জীবনের ছবি এমনই।
গ্যাস ওভেন মেরামত করতেন তাঁর বাবা। আর্থিক কষ্টে কেটেছে ছোটবেলা। মাধ্যমিকে ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে পারেননি। ধানবাদের একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা সেই খবর পেয়ে ঋষিকে স্কুলে ভর্তির খরচ দেন। দেওয়া হয় পড়াশোনার টাকাও। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ঋষি।
পকেটে টান ছিল। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন টাই সেখানেই ছেড়ে দেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ফুটপাথে মোমোর দোকান খোলেন। তখনই ঠিক করেন, স্থানীয় গরিব পরিবারের পড়ুয়াদের বিনামূল্যে পড়াবেন। বাঙালি হলেও বাংলা তেমন ভাল বলথে পারেন না ঋষি। তিনি বলেন, ‘‘এক সময় পয়সার অভাবে বই কিনতে পারিনি। পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সে সব এখনও ভুলতে পারিনি। গরিব পড়ুয়াদের মধ্যে যেন নিজেকেই দেখতে পাই। তাই কাজের ফাঁকে ওদের পড়াই।’’
সকালে ও দুপুরে এক পড়শির বাড়ির ছাদে ক্লাস বসান ঋষি। তিনি জানান, সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৩০ জন বাচ্চাকে পড়ান। দুপুর তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত তাঁর কাছে পড়তে যায় ৬০ জন। তাদের কারও বাবা দিনমজুর, কারও রিকশাচালক। এ রকমই এক অভিভাবক রবি মাহাতো বলেন, ‘‘ঋষিবাবু আমাদের ভগবান।’’
নিজের মোমো স্টলে ঋষি।
সন্ধেয় ঝরিয়ার দেশবন্ধু সিনেমা হলের সামনে মোমোর দোকান বসান ঋষি। তা খোলা থাকে নাইট শো-র বিরতি পর্যন্ত। স্থানীয়রা ওই দোকানের নাম দিয়েছেন— ‘ঋষিস্যারের মোমোর দোকান’। এলাকার বাসিন্দা চন্দন প্রসাদ বলেন, ‘‘ঋষি আমাদের গর্ব। ও বাচ্চাদের বই, ব্যাগ, খাতা, পেন্সিলও কিনে দেয়।’’
নিজের প্রচার অবশ্য চান না ঋষি। তিনি শুধু বলেন, ‘‘মোমোর দোকানটা ভাল করে চালাতে চাই ওই বাচ্চাগুলোর জন্যই। এখান থেকে যা আয় হয়, তার কিছুটা ওদের বইখাতা কেনার জন্য সরিয়ে রেখে দিই। দোকান না চললে সংসার কী ভাবে চলবে, ওই বাচ্চাদেরই বা কি ভাবে সাহায্য করব?’’