দু’দশক পরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান অর্থনৈতিক কমিশনের নিভে যাওয়া বৈঠককে আবার চাঙ্গা করা হল ঢাকার মাটিতে। এবং সেটা করা হল এমন সময়ে, যখন পাকিস্তানের যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান (সিজেসিসি) জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জ়া ঢাকাতেই।
পাকিস্তানের অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী আহাদ খান চিমা এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলি পারভেজ মালিক বাংলাদেশ গিয়ে এই যৌথ কমিশনের বৈঠক করলেন। দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা সমঝোতা সই হয়েছে বাণিজ্য, কৃষি, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎক্ষেত্র, ওষুধ শিল্প-সহ বিভিন্ন বিষয়ে। এই বৈঠকের দিকে সতর্ক নজর রেখে চলছে সাউথ ব্লক। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়টি হল, বাংলাদেশের নোট ছাপানোর ক্ষেত্রটি এ বার পুরোপুরি ভাবে পাকিস্তানের হাতে চলে গেল। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ভারতীয় সীমান্তে এ বার জাল নোটের রমরমা বাড়বে। সে দেশের ‘সিকিয়োরিটি প্রিন্টিং’, ‘প্রাইস বন্ড’, কালি এবং নোট ছাপানোর কাগজ আগে ইউরোপ থেকে আমদানি করত বাংলাদেশ। এ বার এই ক্ষেত্রগুলিতে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানের মধ্যে নানা ভাবে সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে। ইসলামাবাদ ঢাকাকে আশ্বাস দিয়েছে, বাংলাদেশের নোট ছাপার ক্ষেত্রে সব রকম ভাবে তারা সহযোগিতা করবে প্রযুক্তি এবং কাঁচা মাল দিয়ে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রের বক্তব্য, এই উদ্যোগের পিছনে ভারতকে সমস্যায় ফেলার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ছাত্রদের জন্য বছরে ৫০০টি নতুন স্কলারশিপ, টিকার ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণা, আখ শিল্পকে চাঙ্গা করতে সহায়তা, পাকিস্তান হালাল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এর আগেই ঢাকা-করাচি বিমান পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্তও হয়েছে।
রণনৈতিক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানির কথায়, “আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত রাজনীতিতে এটা একটা উল্লেখযোগ্য বদল। মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘন করছে। অথচ পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যার হাত থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছিল রক্তের বিনিময়ে। বার্তা এবং প্রবণতা স্পষ্ট, ভারত-বিরোধী আবেগকে উস্কানি দিয়ে পাশাপাশি, দেশের ভিতরে মৌলবাদী ইসলামকে তোল্লাই দেওয়া। এর ফলে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার উত্তেজনা বাড়বে বই কমবে না।”
কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, বাংলাদেশ আর কয়েক মাস পরেই নির্বাচনে চলে যাবে। ভেঙে দেওয়ার হবে অন্তর্বর্তিকালীন এই ব্যবস্থা। তা হলে এত প্রকল্প ও চুক্তি করার ব্যাপারে পাকিস্তানেরই বা এত উৎসাহ কেন? সূত্রের মতে, এর পর যদি বিএনপি সরকারও আসে, দেশের এখন যা হাওয়া, তাতে তাদের পক্ষেও এগিয়ে যাওয়া যোজনাগুলি বন্ধ করা কঠিন হবে। তা ছাড়া বিএনপি-ও যে পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী বজায় রাখতে চাইবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ইসলামাবাদ চাইছে, বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরতা কমাতে। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশকে কিছুটা সক্ষম করতে আগ্রহী তারা। চিনকে সঙ্গে নিয়েই এ কাজ তারা করতে চাইছে বলে খবর। ঢাকার বাণিজ্য প্রযুক্তি এবং কৌশলগত নির্ভরতা যদি পাকিস্তান এবং চিনের প্রতি বাড়ে, তবে সরকারে যে-ই আসুক, ভারত-বিরোধী ভাষ্য ধরে রাখা সম্ভব হবে ইসলামাবাদের পক্ষে। ভারতের প্রভাব কমবে। গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ইতিমধ্যেই আইএসআই বাংলাদেশের মাটিতে ভাল ভিত তৈরি করেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)