Advertisement
E-Paper

ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কায় ছড়াচ্ছে অসন্তোষ

জীবনদায়ী ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কায় অসন্তোষ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল বোর্ড অব এক্সসাইজ ও কাস্টম এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন যে, বিদেশি ওষুধের উপর আমদানি শুল্কে (কাস্টম ডিউটি) যে ছাড় দেওয়া হয় তা বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে আবগারি শুল্ক (এক্সসাইজ ডিউটি) আরোপ করা হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে আনা প্রায় ৭৬টি ওষুধ আরও দামি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই বৃদ্ধির হার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ২০:৪৪

জীবনদায়ী ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কায় অসন্তোষ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল বোর্ড অব এক্সসাইজ ও কাস্টম এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন যে, বিদেশি ওষুধের উপর আমদানি শুল্কে (কাস্টম ডিউটি) যে ছাড় দেওয়া হয় তা বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে আবগারি শুল্ক (এক্সসাইজ ডিউটি) আরোপ করা হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে আনা প্রায় ৭৬টি ওষুধ আরও দামি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই বৃদ্ধির হার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন

এই সব ওষুধের মধ্যে বেশ কিছু জীবনদায়ী ওষুধ (NLEM) অর্থাৎ ন্যাশনাল লিস্ট অব এসেনশিয়াল মেডিসিনও আছে। যেমন ডায়াবিটিস, ক্যানসার, হিমোফিলিয়া, এইচআইভি, হার্টের অসুখ, আলসারেটিভ কোলাইটিস, অ্যালার্জি, আর্থ্রাইটিস-সহ হাড়ের অসুখ, মেনোপজ, গ্লকোমা, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, রাসায়নিক বা কীটনাশকজনিত বিষক্রিয়া, এসএলই, অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ এবং বাচ্চাদের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার ওষুধ ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প সফল করতে সরকারি তরফে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত আমাদের দেশকে ডায়বিটিসের দিক থেকে বিচার করলে বিশ্বের রাজধানী বলা হয়। ওষুধের দাম বাড়লে ডায়াবিটিস রোগীদের জটিলতা বাড়বে। বহু মানুষ নির্দিষ্ট পরিমাণে ওষুধ না পেলে সমস্যা বাড়বে।

Advertisement

অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে স্টিল অথরিটির পূর্বতন চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা আইএইচএম-এর রিটায়ার্ড প্রিন্সিপাল এমনকী রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব— ওষুধের দাম বাড়ার বিরোধিতা করছেন বহু মানুষ। বারুইপুরের আশি উত্তীর্ণ সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায় সুন্দরবন ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের প্রাক্তন এসডিও। পেনশনের সঙ্গে চিকিৎসা ভাতা বাবদ পান মাসে ৩০০ টাকা। নিজের জন্য কোনও ওষুধ না লাগলেও ৭৫ বছরের স্ত্রীর ডায়াবিটিস থেকে গ্লকোমা, হাই ব্লাডপ্রেশার, হার্টের অসুখ— সবই আছে। ওষুধ বাবদ মসিক খরচ দু’হাজার টাকা। কেন্দ্রীয় সরকার ওষুধের উপর কাস্টম ডিউটির বোঝা চাপালে প্রত্যেকটি ওষুধের দাম বাড়বে। সিনিয়র সিটিজেনদের আয়ের পথ বলতে সরকারি পেনশন। কোনও একটা খরচ কমিয়ে ওষুধ কেনা ছাড়া পথ কোথায়!

লেক গার্ডেন্সের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্টিল অথরিটির চিফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর শক্তি দাসগুপ্ত অবসর নিয়েছে ১৯৮৮ সালে। অবিবাহিত এই ৮৬ বছরের মানুষটির বছরে ওষুধ লাগে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার। কিন্তু অফিস থেকে মেডিক্যাল বেনিফিট বাবদ বছরে আট হাজার টাকার বেশি মেলে না। সেন্ট্রাল বোর্ড অব এক্সসাইজ ও কাস্টমের নোটিশের কথা সংবাদমাধ্যম মারফত কানে এসেছে। কত খরচ বাড়বে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলেও বলেন, “আমাদের আর ক’দিন, তবে বেশি অসুবিধায় পড়বেন মাঝবয়সি মানুষেরা, যাঁরা ক্রনিক অসুখে ভুগছেন।”

আমদাবাদের ৬৭ বছরের সলিল চট্টোপাধ্যায় আইএইচএম-এর (ইনস্টিটিউট অব হোটেল ম্যানেজমেন্ট) প্রাক্তন অধ্যক্ষ। মাসের শেষ চিকিৎসা বাবদ ৫০০ টাকা পান। ওষুধের জন্য স্বামী-স্ত্রীর খরচ মাসে হাজার দুয়েক। ওষুধের দাম বাড়তে পারে শুনে কিছুটা উদ্বিগ্ন তাঁরা। কিন্তু, প্রাধানমন্ত্রীর রাজ্যের এই বাঙালির অগাধ আস্থা “আচ্ছে দিনের” কারিগরের উপর। সলিলবাবুর আশা, প্রস্তাব পাশ হওবার আগেই মোদীজি তা বাতিল করবেন।

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব অর্ধেন্দু সেন জানালেন যে, কিছু মানুষকে সুবিধা দিতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অসুবিধায় ফেলা হচ্ছে। এই ধরনের অবিবেচক সিদ্ধান্ত সবার কাছেই বোঝাস্বরূপ। দেশের প্রায় প্রত্যেক মানুষ প্রতিটি ক্ষেত্রে কর দেন। করের একটা অংশ জীবনদায়ী ওষুধের জন্যে বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই দাবি নিয়ে সোচ্চার হলে হয়ত কাজ হবে।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর অধিকর্তা ও খ্যাতনামা ক্যানসার বিশেষজ্ঞ আশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, “সত্যিই যদি বিদেশি ওষুধের ওপর কর ধার্য করা হয়, তা হলে ক্যানসারের রোগীরা খুব বিপদে পড়বেন। কেননা, ক্যানসারের কয়েকটি ওষুধ যেমন, Abastin, Cituximab ইত্যাদি আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া, রক্তের কিছু বিশেষ ধরনের ক্যানসার, কোলন ক্যানসার, পাকস্থলীর ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, ওভারিয়ান ক্যানসার, ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্রেস্ট ক্যানসার ইত্যাদি অসুখে ব্যবহৃত ওষুধ বিদেশ থেকেই আসে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসারের ওষুধ হিসেবে টার্গেটেড থেরাপি বা বায়োলজিকাল থেরাপি করে রোগীকে সুস্থ রাখা হয়। আর এই মুহূর্তে দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। তাই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখলে ভাল হয়।” এই প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, এ দেশে যে সব সংস্থা ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করে সেগুলির কার্যকারিতা বিদেশি ওষুধের সমমানের। কিন্তু, ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে ৩০ শতাংশের বিদেশি ওষুধ প্রয়োজন। একই মত, খ্যাতনামা গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজিস্ট মহেশ গোয়েঙ্কার। তিনি বলেন, “ক্রনিক হেপাটাইটিসের মতো অসুখে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খেতে হয়। দাম বাড়লে অনেকেই নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ খাবেন না। আর এর ফলে লিভারের অসুখ যেমন সিরোসিস বা ক্যানসারের প্রবণতা বাড়বে।” গ্ল্যাক্সো-র পূর্ব ভারতের দায়িত্বে থাকা সেলসপার্সন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানালেন, কাস্টম ডিউটি বাড়লে ওষুধের দাম বাড়বেই। এর ফলে অসুবিধায় পড়বেন সাধারণ মানুষই। ভিন্নমত শোনা গেল, এমকিওর কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিওনাল ম্যানেজারের কাছে। রোগের হাত থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ ওষুধের দাম বাড়া নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাবেন না বলে মত তাঁর। যিনি এক লক্ষ টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে পারছেন তাঁর কাছে বাড়তি পাঁচ-ছ’হাজার টাকা খুব বেশি মনে হবে না বলে দাবি তাঁর। দীর্ঘ দিন বিদেশে কাটিয়ে দেশে চিকিৎসা করছেন হেমাটো অঙ্কোলজিস্ট সৌম্য ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, শুধু ক্যান্সার নয়, সরকারি উদ্যোগে সমস্ত অসুখের চিকিৎসার খরচ নামমাত্র হওয়া প্রয়োজন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy