রাঁচির চানহুতে দু’বিঘা জমির উপর বাড়ি ও বাড়ি সংলগ্ন একতলা বাজার!
নারী ও শিশু পাচারে অভিযুক্ত লতা লকড়া ধরা পড়ার আগে এই টুকু তথ্যই ছিল পুলিশের হাতে। কিন্তু অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানাচ্ছে, এ শুধু হিমশৈলের চূড়া। ওই বাড়ি ও বাজারের পাশে তৈরি হয়েছে আর একটা একতলা বাজার। আর বাজারের পাশেই রয়েছে একটি হাইস্কুলও। সবেরই মালিক লতা লকড়া। জমি কিনে স্কুল ভবনটি তৈরি করে লতা একটি বেসরকারি সংস্থাকে তা বিক্রি করে দেয়। রাঁচির আশপাশে লতার আরও জমি বাড়ি রয়েছে বলে তদন্তকারীদের অনুমান। দিল্লিতেও রয়েছে কোটি টাকার সম্পত্তি।
গত দশ বছরে লতার উত্থান রকেটের মতোই। অভিযোগ, নারী ও শিশু পাচার করে এক দশকেই কোটিপতি হয়ে গিয়েছিল সে। পুলিশ জানাচ্ছে, ২০০০ সালে রাঁচি থেকে দিল্লি গিয়ে একটি বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করত লতা। ওই কাজ করতে করতেই সে ২০০৩ সালে দিল্লিতে পরিচারিকাদের জন্য একটি ‘প্লেসমেন্ট এজেন্সি’ খুলে ফেলে। ওই প্লেসমেন্ট এজেন্সির আড়ালেই চলত লতার নারী ও শিশু পাচারের কাজ। অভিযোগ, শুধু ঝাড়খণ্ড থেকেই প্রায় দেড় হাজার নারী ও শিশু পাচার করেছিল লতা।
খুঁটির শিশু ও নারী পাচার বিরোধী ইউনিটের ইনস্পেক্টর আরাধনা সিংহ বলেন, ‘‘ঝাড়খণ্ডের নারী ও শিশু পাচারের অভিযোগে পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় নাম ছিল লতার। আন্তর্জাতিক নারী ও শিশু পাচারের সঙ্গে লতার সম্পর্ক আছে কিনা তাও এখন আমরা খতিয়ে দেখছি। শুধু ঝাড়খণ্ড নয়, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেও লতার জাল বিছানো ছিল।’’ নারী পাচার নিয়ে কাজ করে, এমন এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দেওয়া কিছু সূত্র ধরেই লতা লকড়ার নাগাল পেয়েছে পুলিশ। ঝাড়খণ্ডের এক পুলিশ কর্তার কথায়, ‘‘শিশু ও নারী পাচারের অভিযোগে ঝাড়খণ্ড থেকে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা আগেও হয়েছে। কিন্তু নারী ও শিশু পাচার করে লতা লকড়া যা সম্পত্তি বানিয়েছে তা অবিশ্বাস্য। কোটিপতি লতার ঝাড়খণ্ড ছাড়াও দিল্লিতে কোথায় কোথায় সম্পত্তি রয়েছে, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।’’
রাঁচি থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে চানহুর গঞ্জ এলাকাতেই লতার বাড়ি ও বাড়ি লাগোয়া বাজার। ওই বাজারের বেশিরভাগ দোকানই অবশ্য আজ দুপুরের দিকে বন্ধ ছিল। সব দোকান ঘরই ‘লতাজি’ ভাড়া দিয়েছেন বলে জানালেন মোটর পার্টসের এক দোকানদার। বাজার সংলগ্ন লম্বা জমিতে রয়েছে তাঁর বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে অবশ্য বাড়িটি নিতান্তই আড়ম্বরহীন। পাকা বাড়ি, টিনের চাল। তবে গেট ঠেলে উঠোন হয়ে ঘরে ঢুকলে থ’ হয়ে যেতে হয়। দামি সোফা থেকে শুরু করে নানা রকম দামি আসবাব পত্রে ঠাসা ঝাঁ-চকচকে ড্রয়িং রুম। ড্রয়িং রুমে উঁকি মারতেই রে রে করে তেড়ে এলেন এক মহিলা। মধ্যবয়স্কা নিজেকে লতার আত্মীয় বলে দাবি করে বললেন, ‘‘যা জানার থানায় গিয়ে জানুন। এখানে কিছু নেই। দিদিকে কেন গ্রেফতার হতে হল আমরা জানি না।’’
লতার বাড়ির পিছন দিকে লম্বা টানা বারান্দা। বারান্দা সংলগ্ন পর পর কয়েকটি ঘর। প্রতিটি ঘরের উপরে নম্বর লেখা, এক, দুই, তিন...। লতার আত্মীয়া জানালেন, ঘরগুলিতে ভাড়াটিয়ারা থাকে। তবে এক থেকে দশ, কোনও ঘরেই ভাড়াটিয়া দেখা গেল না। সব ঘরই তালাবন্ধ। ভাড়াটিয়ারা কোথায়, তার উত্তরও নেই আত্মীয়ার কাছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘরগুলিতে সত্যি ভাড়াটিয়া থাকে, না পাচারের আগে মহিলা ও শিশুদের এনে রাখা হতো, সে ব্যাপারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লতার পড়শিরা জানালেন, ২০০০ সালে চানহু থেকে দিল্লি চলে যাওয়ার পরে লতা চানহুতে খুব কমই আসত। অধিকাংশ সময়ই দিল্লিতে থাকত। তবে চানহুতে যখন আসত, তখন তার কোনও বারফাট্টাই ছিল না বলেই পড়শিদের দাবি। গত কয়েক বছরের মধ্যেই লতা যে প্রচুর টাকা পয়সা করে নিয়েছে, তা তাঁরা বুঝতেন। কারণ গত তিন চার বছরের মধ্যেই লতা চানহুতে কয়েক বিঘা জমি কিনে ফেলেছিল। দু’দুটো বাজার বানিয়ে দোকান ঘর ভাড়া দিয়েছিল। স্কুল ঘর তৈরি করেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, লতার স্বামী বিসিসিএল এর এক সামান্য ঠিকাদার। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘‘এত কম সময়ে এত টাকা-পয়সা কী করে হল, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। লতা আমাদের বলেছিল, দিল্লিতে তার প্লেসমেন্ট এজেন্সি রয়েছে। সেটা খুব ভাল চলছে। তার জেরেই এত কিছু। আমরা গ্রামের মানুষ, কী বুঝব বলুন!’’ তবে লতার বাড়িতে বিশেষ কেউ ঘেঁষতেন না। বাড়ির সদর দরজা সব সময় বন্ধই থাকত। বাড়িতে লতার কয়েকজন আত্মীয় থাকলেও তাঁরাও পাড়ায় মেলামেশা করতেন না।