লক্ষ্য স্থির রেখে শেষমেশ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলেই আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। রাতেই শক্তি খুইয়ে গভীর নিম্নচাপের চেহারা নিয়েছে সে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের আকাশ থেকেও তার প্রভাব কাটতে শুরু করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল থেকে বাংলাদেশ, এই যাত্রাপথে মৌসম ভবনকে ধাঁধা উপহার দিয়ে গিয়েছে রোয়ানু। এ বার সেই ধাঁধার সমাধান করাটাই নয়া চ্যালেঞ্জ কেন্দ্রীয় আবহাওয়া বিভাগের বিজ্ঞানীদের কাছে।
কী সেই ধাঁধা? তার সমাধান করাটা চ্যালে়ঞ্জ-ই বা কেন?
উপগ্রহ-চিত্র মারফত রোয়ানুর উপরে নজরদারি চালাতে গিয়ে মৌসম ভবনের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যাত্রাপথে হঠাৎ হঠাৎ চেহারা বদল করছিল সে। তার জেরে বদলে যাচ্ছিল উপকূলীয় এলাকার উপরে তার প্রভাবও। বহরে বাড়ার সময় অনেক দূরের এলাকাতেও সে বৃষ্টি ঝরাচ্ছিল। আবার বহরে ছোট হয়ে যাওয়ার সময় কাছের এলাকাতেও তেমন প্রভাব ফেলতে পারছিল না সে।
এমন ঘটনার উদাহরণ দিতে গিয়ে মৌসম ভবনের এক বিজ্ঞানী বলেন, ওড়িশা উপকূলের কাছাকাছি থাকার সময়ই বাংলাদেশ উপকূলের একাংশে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আবার পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে যাওয়ার সময়ও উপকূলীয় এলাকা থেকে একটু দূরের জায়গাগুলিতে জোরালো বৃষ্টি হয়নি। মূলত ভোর বা সকালের দিকেই বহর বাড়ছিল তার। রাত হলেই তা আবার কমে যাচ্ছিল। এই চেহারা বদলের গেরোয় এ বার অনেক সময়ই নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দিতে গিয়ে ঝক্কিও পোহাতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। কিছু ক্ষেত্রে আচমকা বদলে গিয়েছে আবহাওয়ার মতিগতি!
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাঞ্চলীয় ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল গোকুলচন্দ্র দেবনাথ বলছেন, ‘‘সকাল-বিকেল চেহারা বদলের ছবিটা রোয়ানুর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে। এটা সাধারণত দেখা যায় না। সে দিক থেকে এটাকে বিরলই বলা চলে।’’ রোয়ানুর এমন চেহারা বদল করল কেন, তার নির্দিষ্ট উত্তর আলিপুর আবহাওয়া দফতরের কাছে নেই। মৌসম ভবনে বসে এই ঘূর্ণিঝড়ের উপরে নিরন্তর নজরদারি চালিয়েছেন ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা বিভাগের বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তাঁরাও কোনও সদুত্তর দিতে পারছেন না।
মৌসম ভবনের ঘূর্ণিঝ়ড় সতর্কতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্রের কথায়, ‘‘ঠিক কী কারণে এমনটা হল, তা সবিস্তার গবেষণার পরেই বলা সম্ভব।’’ তিনি জানান, রোয়ানুর ক্ষেত্রে যে বৈশিষ্ট্য নজরে এসেছে, তা বিরল বটে।
তবে দুনিরায় আরও কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গিয়েছিল। তা নিয়ে নানা জায়গায় গবেষণা চললেও এখনও নির্দিষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার সকালে অন্ধ্রের মছলিপত্তনমের কাছে জন্ম নিয়েছিল রোয়ানু। গোড়া থেকেই মৌসম ভবন জানিয়েছিল, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে আছড়ে পড়বে সাগরের এই ‘অতিথি’। সেই লক্ষ্য মেনে এ দিন বিকেলে চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে স্থলভূমিতে ঢুকে পড়েছে রোয়ানু। সেখানে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ফলে তার শক্তিক্ষয়ও হচ্ছে। মৌসম ভবনের পূর্বাভাস, দুই ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকা ছাড়া এ রাজ্যে তেমন আর বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, এ দিন সকালে সাগরদ্বীপ থেকে ২৭০ কিলোমিটার দূর থেকে রোয়ানু বাংলাদেশের চট্টগ্রামের দিকে বাঁক নিয়েছিল। সে সময় তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। সেই গতিতে কিছু দূর এগোনোর পরে গতি কমে দাঁড়ায় ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। সংবাদসংস্থা জানিয়েছে, রোয়ানুর প্রভাবে এ
দিন চট্টগ্রামের উপকূলে ৮৮ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়েছে। প্রবল বৃষ্টিও হয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস ছিল, পশ্চিমবঙ্গের উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়ার ফলে শনিবার পূর্ব মেদিনীপুর এবং দুই ২৪ পরগনার উপকূলীয় এলাকাগুলিতে ভারী বৃষ্টি হবে। মিলবে ঝোড়ো হাওয়া-জলোচ্ছ্বাসও। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গেও জোরালো বৃষ্টির কথা জানিয়েছিল তারা। এ দিন হাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার রাতে পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার একাংশে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকাগুলিতে ঝোড়ো হাওয়া থাকলেও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এ দিন সকাল থেকে মেঘও কমতে শুরু করেছে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের আকাশে। বিক্ষিপ্ত ভাবে বৃষ্টি হলেও তার জোর তেমন ছিল না। আজ, রবিবার থেকেই গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে আবহাওয়ার উন্নতির কথা জানিয়েছে হাওয়া অফিস।