কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ও তার অধীনে থাকা পুলিশের বিরুদ্ধে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্রে পেয়ে গেলেন অরবিন্দ কেজরীবাল। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত-বিরোধী স্লোগান তোলার অভিযোগের সূত্রে ধরপাকড় চালাচ্ছে দিল্লি পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেস, বাম ও অন্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি একজোটে আক্রমণ শানাচ্ছে মোদী সরকারের ‘অসহিষ্ণুতা’র বিরুদ্ধে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরীবালও আজ সারা দিনই টুইট করে গিয়ে গিয়েছেন বিষয়টি নিয়ে। দিনের শেষে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, সত্যিই জেএনইউ-এ কোনও ছাত্র ভারত-বিরোধী স্লোগান দিয়েছেন কি না তা নিয়ে তদন্ত করবে তাঁর সরকার।
সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআইয়ের ডি রাজা, পল্লব সেনগুপ্ত, জনতা দলের কে সি ত্যাগীর মতো নেতারা আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহর সঙ্গে দেখা করে অবিলম্বে কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেওয়ার দাবি জানান। সিপিআই ছাত্র সংগঠনের নেতা কানহাইয়াকে ভারত-বিরোধী স্লোগান দেওয়া তথা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ধরা হয়েছে। বাম নেতাদের দাবি কানহাইয়া এ কাজ করেননি। এবং এটা তিনি করতেই পারেনন না। ইয়েচুরির যুক্তি, কাশ্মীর যে ভারতের অংশ, তা বামেদের পুরনো অবস্থান। কানহাইয়া কোনও স্লোগান দেননি। তিনি দুই দলের বচসা থামাতে গিয়েছিলেন। রাজনাথের কাছে তাঁদের দাবি, তিন দিনের পুলিশ হেফাজতের পরে সোমবার কানহাইয়াকে আদালতে পেশ করা হলে দিল্লি পুলিশ যেন তাঁর জামিনের বিরোধিতা না করে।
কী বলছেন রাজনাথ? তাঁর বক্তব্য, কোনও দোষী যাতে সাজা না পান সেটা তিনি দেখবেন। রাজনাথ অবশ্য আগেই দাবি করেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। তারা ভারতের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের পক্ষে ও কাশ্মীরের আজাদির দাবিতে স্লোগান দিয়েছেন। ইয়েচুরি আজ বলেন, ‘‘পুলিশ যে ভিডিও ক্লিপ আদালতে পেশ করেছে, তা কোথা থেকে এল? জেএনইউ-এর উপাচার্যর পদে নিজেদের লোক বসানোর পরেই এই ঘটনা ঘটছে।’’ বাম নেতাদের অভিযোগ, পুরোটাই এবিভিপি-র চক্রান্ত। সংবাদমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে যারা স্লোগান দিচ্ছিল, পরে তারাই এবিভিপি-র প্রতিবাদে যোগ দিয়েছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালের সঙ্গে দেখা করে পুরো ঘটনার তদন্তের দাবি করেন বাম ও জেডি(ইউ) নেতারা। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসৌদিয়া বলেন, ‘‘ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোটাই পুলিশের আসল উদ্দেশ্য ছিল।’’
বিজেপি বলছে, কংগ্রেস-বামেরা রাজনীতি করতে চাইছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা রাষ্ট্রদ্রোহ রাজনীতির বিষয় নয়। রাহুল গাঁধী আজ জেএনইউ-এ গেলে এবিভিপি-র সদস্যরা তাঁকে কালো পতাকা দেখান, স্লোগান দেন। এবিভিপির হাতে হেনস্থা হন কংগ্রেসের আনন্দ শর্মাও। এর প্রতিবাদে কংগ্রেসের তরফে আজ এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘এই গুন্ডামিই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির মানসিকতার পরিচয়। এবিভিপি-র গুন্ডাদের বিরুদ্ধে মোদী সরকার কি ব্যবস্থা নেবে?’’ পুরস্কার ফেরতের হুজুগ কিছুটা ঢিমে হয়ে এলেও কিছু প্রাক্তন ফৌজি আবার আজ জেএনইউ-এর কাছে নিজেদের ডিগ্রি ফেরত দিতে চেয়েছেন।
কংগ্রেস-বাম নেতারা বলছেন, হায়দরাবাদের সঙ্গে জেএনইউ-এর ঘটনার মিল রয়েছে। হায়দরাবাদে ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয়। জেএনইউ-এ সেই কাজটি করেন দিল্লির সাংসদ মহেশ গিরি। দু’জায়গাতেই এবিভিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে প্রথম অভিযোগ জানান। তাঁদের দেওয়া নামের তালিকা নিয়ে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। রাহুল-ইয়েচুরির দাবি, এ ক্ষেত্রেও মূল উদ্দেশ্য, বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠরোধ করা। জেএনইউ বাম-মনস্ক ও বাম তাত্ত্বিকদের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত বলেই একে নিশানা করা হচ্ছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।
পুলিশি হয়রানির অভিযোগের সরব দিল্লির কাশ্মীরি পড়ুয়ারাও। গত মঙ্গলবার জেএনইউ চত্বরে আফজল গুরুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিক্ষোভ-সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তার জেরে পুলিশ নানা ভাবে অপদস্থ করছে তাঁদের। হয়রানির জেরে উদ্বেগে কাশ্মীরিরা। দিল্লির এক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার কথায়, ‘‘পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য তথ্য খুঁটিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে। সঙ্গে জেএনইউ বিক্ষোভ নিয়েও জেরা করা হচ্ছে।’’