রফতানি বাণিজ্যের অধোগতি থামছে না। এমনকী আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা তেলের দাম তলানিতে নামলেও অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো ছাড়া আর তার কোনও সুবিধা নিতে পারছে না সরকার। এই অবস্থায় সংস্কারে বাধার জন্য অরুণ জেটলি-পীযূষ গয়ালরা গাঁধী পরিবারের ওপরেই সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়ায় পাল্টা সংঘাতে নেমে পড়ল কংগ্রেসও।
সরকারের ঝাঁঝালো সমালোচনা করে প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যসভায় কংগ্রেসের উপ দলনেতা আনন্দ শর্মা আজ বলেন, ‘‘ব্যর্থতা থেকে মুখ লুকোতে জেটলি ছুতো খুঁজছেন। এই সরকার বুঝে গেছে দেশ ও অর্থনীতিকে বৃদ্ধির পথে ধরে রাখা তাদের কম্ম নয়! তাই বিরোধীদের ওপর দায় চাপিয়ে লজ্জা ঢাকতে চাইছে।’’
সংসদের এ বারের শীত অধিবেশন যখন শুরু হয়েছিল তখন সরকার-বিরোধী সংঘাতের এই আবহ ছিল না। সংসদে পণ্য পরিষেবা কর বিল পাশ করানোর জন্য সনিয়া গাঁধীকে চায়ের নিমন্ত্রণ পর্যন্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু বাজেট অধিবেশনের আগে সংঘাতের সুর বেঁধে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। সম্প্রতি একটি জনসভায় মোদী বলেছিলেন, ‘‘কংগ্রেস নতুন বছরে শপথ নিক সংসদ আর অচল করবে না, দেশের উন্নতিতে বাধা দেবে না!’’ আবার ইদানিং অর্থমন্ত্রী জেটলি বা সরকারের অন্য মন্ত্রীরা শিল্পমহলের মুখোমুখি হলেই সংস্কারে ব্যর্থতার জন্য কংগ্রেসের ওপর সরাসরি চাপাচ্ছেন।
গত কাল আবার একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে শিল্প মহলের কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চক্রে জেটলি বলেন, আর্থিক সংস্কারে বিলম্বের জন্য বাধা আসলে রাজনীতি নয়। তিনি বলেন, ‘‘কংগ্রেসের অনেক নেতাও সংস্কারে একমত। কিন্তু তাদের হাইকম্যান্ড সায় দিচ্ছে না। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির জন্য উন্নয়ন আটকে থাকছে।’’ সন্দেহ নেই জেটলি গাঁধী পরিবারকেই নিশানা করেছেন।
বিজেপির এই রণকৌশলে তেলে বেগুনে চটেছে কংগ্রেস। আনন্দ শর্মা আজ বলেন, ‘‘ইউপিএ জমানায় এই জেটলিই রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবে সংস্কারের বিলগুলির গতিরোধ করেছিলেন। তাঁর ও তাঁর দলের বাধার কারণেই পণ্য পরিষেবা কর এবং বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানো সংক্রান্ত বিল সেই সময় পাশ হয়নি। অথচ গত আঠারো মাসে কংগ্রেস সংসদে সাহায্য করেছে বলেই বিমা বিল, কয়লা ও খনি বণ্টন বিল-সহ ৪৫টি বিল পাশ হয়েছে।
এমনকী বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল-সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত যে সংবিধান সংশোধন বিলে ইউপিএ জমানায় বিজেপি আপত্তি করেছিল, কংগ্রেস সেই বিল এ বার রাজ্যসভায় পাশ করাতে সাহায্য করেছে। আসলে এই সরকারের নেতারা জানেনই না কী ভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়। কারণ মোদী সরকার দাম্ভিক এবং সংঘাতপন্থী!’’
আগামী মাসেই শুরু হবে সংসদের বাজেট অধিবেশন। মোদী সরকারের তৃতীয় বাজেট পেশ হওয়ার আগেও যদি এমনই চাপানউতোর চলে, তা হলে এই অধিবেশনও পণ্ড হওয়ার দিকেই এগোবে।
এর মধ্যেই আবার সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নিতিন গডকড়ীর দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে কংগ্রেস। তবে বিরোধীরা তো এই রাজনীতি করবেই। বরং এই প্রশ্নই উঠেছে— সরকার কেন জেনেবুঝে সংঘাতের পথে যাচ্ছে?
জবাবে বিজেপি নেতারা ঘরোয়া আলোচনায় বলছেন— এটা স্পষ্ট যে বাজেট অধিবেশনেও কংগ্রেস পণ্য পরিষেবা কর বিল পাশ হতে দেবে না। কারণ সনিয়া-রাহুল সেটা চান না। সেই জন্যই গাঁধী পরিবারকে নিশানা করা হচ্ছে।
কিন্তু অনেকেই বলছেন, এমন নয় যে জিএসটি পাশ হলেই অর্থনীতির চাকা দুদ্দাড় গড়াতে শুরু করবে। বরং তাতে রাজ্যের আর্থিক স্বায়ত্বশাসনে হস্তক্ষেপ করা হবে। হতে পারে, দেশের আর্থিক বৃদ্ধির আশু যে কোনও সম্ভাবনা নেই— তা বুঝতে পারছেন জেটলিরা। তাই বিরোধীদের নিশানা করার পথ বেছে নিয়েছেন। এর পর বাজেট অধিবেশনও কংগ্রেসের বাধায় পণ্ড হলে সেটাও হাতিয়ার করবে শাসক দল।
তবে আনন্দ শর্মা আজ বলেন, বিরোধীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে এ ভাবে সরকার কত দিন চালাতে পারে, আমরাও দেখছি। মানুষ এতো বোকা নয়!